দুই যুগের ব্যবধানে দেশে চা উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হলেও সে হারে বাড়েনি রপ্তানি। বরং দুই যুগ আগে রপ্তানিতে যে জৌলুস ছিল তা এখনো ফেরেনি। চা উৎপাদন ও বাজারজাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের যে কদর ছিল সেটা আবারও একটু একটু করে বাড়লেও সেটা দুই যুগ আগের যে বাজার তার ধারেকাছেও নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মান এবং দামে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকার কারণে রপ্তানি বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। তবে আশার কথা, ২০২৪ সালে চা রপ্তানি হয়েছে ও ১৯টি দেশে এবং পরিমাণও বেড়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০১ সালে দেশে চায়ের উৎপাদন ছিল ৫ কোটি ৩১ লাখ কেজি, যা ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজিতে। যদিও ২০২৩ সালে এই উৎপাদন ছিল ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি। অর্থাৎ এক যুগে চায়ের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
উৎপাদন দ্বিগুণ হলেও প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের চা আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০০১ সালে ১ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা রপ্তানি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ৮৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর পরের বছর গত দুই যুগের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ চা রপ্তানি হয়েছিল। অর্থাৎ ২০০২ সালে ১ কোটি ৩৬ লাখ কেজি চা রপ্তানি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ৯৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
সবশেষ ২০২৪ সালে রপ্তানি হয়েছে ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা, টাকার অঙ্কে যার মূল্য ৪৫ কোটি ৯৫ লাখ। যদিও এটা আগের বছরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। কারণ আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল ১০ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা। জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকেই রপ্তানির বাজার হারাতে থাকলেও ২০১০ সালে এসে একেবারেই তলানিতে নামে চায়ের রপ্তানি। এরপর থেকে ২০১৪ ও ২০১৭ সালে শুধু ২০ লাখ কেজির বেশি চা রপ্তানি করতে পেরেছিল বাংলাদেশ।
উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বাংলাদেশে চায়ের বাজার এখন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার। উৎপাদনের বেশিরভাগটাই এখন স্থানীয় বাজারের ভোক্তার চাহিদা পূরণে ব্যবহার হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজার ধরতে চায়ের গুণগতমানসম্পন্ন ভিন্ন ভিন্ন জাত উদ্ভাবন জরুরি। এটা করা গেলে আমাদের চা শিল্পে ভ্যালু অ্যাডিশন হবে। সামগ্রিক প্রক্রিয়াটির জন্য গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বরাদ্দের প্রয়োজন।
বাংলাদেশীয় চা সংসদের চেয়ারম্যান কামরান তানভীর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই যুগ আগের যে রপ্তানি এখনো আমরা তার ধারেকাছেও যেতে পারিনি। আসলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে কোয়ালিটির চায়ের চাহিদা বেশি আমাদের চা তার চেয়ে মানে খানিকটা কম। যে কারণে মূল্যটাও কম পাওয়া যায়। এটা একটা সমস্যা, যা আমরা উত্তরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ২০০০ সালের পর আমাদের চা উদ্বৃৃত্ত থাকত কারণ তখন দেশের চাহিদা কম ছিল, সে সময় আমরা বেশি করে চা রপ্তানি করেছি। কিন্তু এর কয়েক বছরের মধ্যে দেশের বাজারে ব্যাপক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের কাছে উদ্বৃত্ত চা থাকত না রপ্তানি করার মতো। এখন অবশ্য অনেক বেশি চা উৎপাদন হচ্ছে, যেখানে ৮ কোটি ৫০ লাখ কেজি বা তারও একটু বেশি স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
চলতি বছর প্রায় এক কোটি কেজির বেশি চা রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় দাম বেশি পড়ছে, আবার মানে খানিকটা পিছিয়ে। যেমন শ্রীলঙ্কার চেয়ে আমাদের চায়ের দাম প্রায় দ্বিগুণ।
চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের চা রপ্তানি এখন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এ রপ্তানি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে সরকারের প্রণোদনা। গত বছর থেকে রপ্তানির বিপরীতে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে রপ্তানিকারকদের।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১৭০টি চা বাগান রয়েছে। এসব চা বিভিন্ন কোম্পানি বাজারজাত করছে। বিক্রিও হচ্ছে নানা পদের চা। এর মধ্যে বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে নানা পদের অর্গানিক চায়ের। মানভেদে বাজারে প্রতি কেজি চা বিক্রি হচ্ছে ২০০-২০০০ টাকার মধ্যে। চা বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে কাজী অ্যান্ড কাজী, হালদা ভ্যালি, জাফলং, ফ্রেশ, সিলন, ফিনলে, ইস্পাহানি মির্জাপুর, ন্যাশনালসহ বিভিন্ন কোম্পানি চা বাজারজাত করছে।
চা বোর্ডের সদস্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) ড. পীযূষ দত্ত জানান, এখন সমতলেও চা উৎপাদন হচ্ছে। তবে সমতলের চায়ের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে শুধু পঞ্চগড়ে। তিনি বলেন, চা উৎপাদনকারীরা ২০১৮ সালের পর থেকে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। যে কারণে ব্যবসাটা এখন লাভজনক পর্যায়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। কারণ যে দামে চা বিক্রি হয় (অকশন প্রাইস) তার চেয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
চায়ের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও চা-বাগানে কাজ করা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এখনো অনেক কম। এ নিয়ে অনেক সমালোচনাও রয়েছে। ২০২১ সালের পর চা শ্রমিকদের মজুরি ১২০ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের রেশন, থাকার জায়গা, শিক্ষা, চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হয়।