মানুষের জীবনে ভালোবাসা এক অনিবার্য অনুভূতির নাম। এই অনুভূতির উৎস যদি হয় আত্মিক, পবিত্র ও নিঃস্বার্থ, তবে তা শুধু মানুষকে মানুষই করে না, তাকে জান্নাতের উপযুক্ত বানিয়েও তুলে। তবে ভালোবাসার সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ধাপ হলো আল্লাহতায়ালার ভালোবাসা লাভ করা। এটি এমন এক মর্যাদা, যা দুনিয়ার কোনো পদ-পদবি বা সম্পদ দিয়ে অর্জন করা যায় না। এই ভালোবাসা পেতে হয় আমল, ইখলাস এবং নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন পরিচালনার মাধ্যমে।
আল্লাহতায়ালা কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান ৭৬) এই আয়াতে স্পষ্ট যে, তাকওয়া বা আল্লাহভীতি হলো তার ভালোবাসা লাভের মূল চাবিকাঠি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য ঘৃণা করে, আল্লাহর জন্য কিছু দেয় এবং আল্লাহর জন্যই কিছু থেকে বিরত থাকে, সে ব্যক্তিই পরিপূর্ণ ইমানদার।’ (আবু দাউদ)
আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া, এই চিন্তাটিই একজন মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধি ও হৃদয় সংস্কারের পথ খুলে দেয়। শুধু বাহ্যিক কর্মে নয়, অন্তরের গভীরে যে ভালোবাসা জন্মায় আল্লাহর জন্য, সেটিই বান্দাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত করে।
কাউকে ভালোবাসার মানদণ্ড হলো একমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালোবাসতে হবে। এটাই শ্রেষ্ঠ কর্মপন্থা। যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসেন তাদের আল্লাহতায়ালা তার রহমত ও করুণার পাশাপাশি আরও একটি দুর্লভ অনুগ্রহ দান করবেন, যা অর্জন করা খুব কঠিন। আর তা হলো, সেই বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা! কত অসাধারণ এই ভালোবাসা, যা একজন মানুষকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যায়, যখন স্বয়ং আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা হতে জানা যায়, দুই ব্যক্তির মধ্যে সে উত্তম, যে অপরকে আল্লাহর জন্য বেশি ভালোবাসে। ইসলামের শিক্ষা ভালোবাসা ছড়াতে সাহায্য এবং একটি সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়তা করে। কেউ যদি তার মুসলিম ভাইকে ভালোবাসে তার উচিত তাকে জানিয়ে দেওয়া। এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে ভালোবাসে, তাকে বলতে দাও যে সে তাকে ভালোবাসে।’ (আবু দাউদ)
আলেমদের মতে, ‘আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য ঘৃণা করার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে কথা, কাজ ও ইমানের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা। আর এটা হচ্ছে এমন একটা ভিত্তি, যা দ্বারা অন্তর ইমানের সৌন্দর্য এবং পরম আশ্বস্ততা অনুভব করে।’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তির মধ্যে নি¤েœর তিনটি গুণ থাকবে, সে ইমানের মাধুর্যতা লাভ করবে। এক. তার কাছে আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) অন্য যেকোনো কিছুর তুলনায় অধিক প্রিয় হবে। দুই. যে একজনকে ভালোবাসে এবং তাকে ভালোবাসে শুধু আল্লাহর জন্য। তিন. কেউ কুফরিতে ফেরত যাওয়াকে এমনভাবে ঘৃণা করে, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে ঘৃণা করে।’ (সহিহ বুখারি)
একজন প্রকৃত মুমিনের ভালোবাসার দাবি হলো, যেকোনো মুসলিম ভাইয়ের আনন্দ-দুর্দশার সঙ্গী হওয়া। অন্য মুসলমানকে গালি দেওয়া, ঠাট্টা করা এবং গিবত করা থেকে বিরত থাকা। দলাদলি, ভাগাভাগি ও মতানৈক্য পরিহার করা।
আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা। একজন মুমিন সারা জীবন যা কামনা করেন, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছু হতে পারে না যে, আল্লাহ যেন তাকে ভালোবাসেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। এই ভালোবাসা অর্জনের উপায়গুলো কঠিন নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা, রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ এবং বান্দার সঙ্গে আন্তরিক ও নিঃস্বার্থ আচরণই এই ভালোবাসার পথে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
আমরা জেনেছি, যারা পরস্পরকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসে, তাদের জন্য আল্লাহর নিকট রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। এমনকি কেয়ামতের দিন যখন কোনো ছায়া থাকবে না, তখন এরূপ ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধদের আল্লাহ তার আরশের ছায়া দান করবেন, এটা রাসুল (সা.)-এর সুসংবাদ। (সহিহ বুখারি)
বর্তমান সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ, দলাদলি ও আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার মধ্যে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা চর্চা করা একটি দুর্লভ অথচ অত্যন্ত জরুরি গুণ। এই ভালোবাসা শুধু আত্মিক শান্তি এনে দেয় না, বরং এটি সামাজিক স্থিতি, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের ভিত্তি গড়ে তোলে।
সুতরাং আমাদের উচিত, নিজের অন্তরে আল্লাহর জন্য ভালোবাসার অনুভূতি গড়ে তোলা, অন্য মুসলিম ভাইকে ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসার কথা প্রকাশ করা। আমাদের কথাবার্তা, ব্যবহার, আমল ও অভিপ্রায় সবকিছুতেই আল্লাহর সন্তুষ্টির ছাপ থাকা চাই। তখনই আমরা ধীরে ধীরে সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারব, যেখানে আমাদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা বর্ষিত হবে। এই ভালোবাসাই হবে চূড়ান্ত সফলতার চাবিকাঠি।