উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত ৪.২৭% নারী

দেশের ১৯ শতাংশ নারী স্তন ক্যানসার ও ১২ শতাংশ জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত। এ ছাড়া খাদ্যনালি ক্যানসারে ১১ শতাংশ, গলব্লাডার ক্যানসারে ৮ শতাংশ, ঠোঁট ও মুখগহ্বর ক্যানসারে ৭ শতাংশ ক্যানসারে আক্রান্ত। অন্যান্য ক্যানসারে আক্রান্ত ৪৩ শতাংশ নারী, যা শনাক্ত করা যায়নি। গত আট বছরে দেশে জরায়ুমুখ ক্যানসার ৭ শতাংশ ও স্তন ক্যানসার ৫ শতাংশ কমেছে। ২০১২ সালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন ২৪ শতাংশ ও জরায়ুমুখ ক্যানসারে ১৯ শতাংশ নারী।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচি প্রকল্পের জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেনশন সেন্টারে তথ্য ও ফলাফলসংবলিত গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক এবং বিএমইউর গাইনি অনকোলোজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেসা। জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচির আওতায় গত পাঁচ বছরে (২০২১-২৫) ৩৮ হাজার ১৮৩ জন নারী স্ক্রিনিং করে এই তথ্য পাওয়া যায়।

জরিপে বলা হয়েছে, দেশে বিশেষ করে পাঁচ বছরে জরায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য দায়ী হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সংক্রমণের হার বেড়েছে। এই ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের ৪ দশমিক ২৭ শতাংশের শরীরে ভাইরাসটির অস্তিত্ব মিলেছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন নারীর মধ্যে প্রায় পাঁচজন নারীর পরীক্ষায় যৌন সংক্রমিত এই ভাইরাসটি রয়েছে।

বিএমইউ চিকিৎসকরা বলেছেন, এইচপিভির এই হার অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে দেশের নারীদের জন্য এই ভাইরাসটি ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এইচপিভি সংক্রমণ বেড়েছে : গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩৮ হাজার ১৮৩ জন নারীর এইচপিভি স্ক্রিনিং করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪৩১ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে আর ৩৬ হাজার ৭৫২ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। অর্থাৎ, ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ বা গড়ে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৪ জন নারী এইচপিভি ভাইরাসে আক্রান্ত।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ বছরে ভাইরাসটির সংক্রমণ বেড়েছে। ২০২১ সালে এইচপিভি সংক্রমণের হার ছিল ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০২২ সালে ৩ দশমিক ৫৭, ২০২৩ সালে ৩ দশমিক ৫২, ২০২৪ সালে ৪ দশমিক শূন্য ৩ ও এ বছর এখন পর্যন্ত হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এইচপিভি ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত করে যথাসময়ে চিকিৎসা নেওয়া গেলে জরায়ুমুখ ক্যানসারে রূপ নেওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য জাতীয় পর্যায়ে এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি ব্যাপক স্ক্রিনিং ও সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেসা বলেন, ‘প্রতিবছর স্ক্রিনিংয়ের হার বাড়ছে, এটি একটি ইতিবাচক। কিন্তু এই ব্যবস্থা এখনো শহরকেন্দ্রিক। গ্রামীণ নারী জনগোষ্ঠীকে আমরা যতটা সম্ভব এই কার্যক্রমের আওতায় আনতে চাই। যেহেতু এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রাথমিকভাবে ধরা পড়লে ক্যানসার প্রতিরোধ সম্ভব, তাই সরকারের পাশাপাশি সব শ্রেণির অংশগ্রহণ প্রয়োজন।’

উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভি ৪% : গবেষণায় জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রধান কারণ এইচপিভির ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (এইচআর)’ সংক্রমণের এলাকাভেদে তারতম্য পাওয়া গেছে। এর হার সর্বনিম্ন ২ দশমিক ৫৬ থেকে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে নারীদের মধ্যে এইচআর-এইচপিভি সংক্রমণের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ ৪ শতাংশ জরায়ুমুখ ক্যানসার রোগীর মধ্যে এইচপিভির উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সংক্রমণ রয়েছে।

বিএমইউয়ের গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলোজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নূর-ই-ফেরদৌসের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের তিন জেলায় (ঝালকাঠি, কক্সবাজার ও বাগেরহাট) বিবাহিত নারীর মধ্যে এইচআর-এইচপিভি সংক্রমণের হার ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ পাওয়া গেছে ঝালকাঠিতে, ৩ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি পাওয়া জিনোটাইপ ছিল এইচপিভি ধরন ১৬, ৩৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

এইচআর-এইচপিভি বেশি সিলেটে, কম রাজশাহীতে : বিএমইউয়ের গাইকোলজিক্যাল অনকোলোজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শিরিন আক্তার বেগমের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এইচআর-এইচপিভি সংক্রমণের হার ছিল সর্বোচ্চ সিলেট বিভাগে, ৬ দশমিক ২ শতাংশ ও সর্বনিম্ন রাজশাহীতে ২ শতাংশ। এ ছাড়া বরিশালে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৪ দশমিক ৬, ঢাকায় ৩ দশমিক ৯, খুলনায় ৩, ময়মনসিংহে ২ দশমিক ৮ ও রংপুরে ২ দশমিক ২ শতাংশ।

সিলেটের গ্রামীণ অঞ্চলে সংক্রমণ ছিল সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছিল চট্টগ্রাম শহরে ৬ শতাংশ। ৩৫-৩৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সংক্রমণের হার সর্বাধিক পাওয়া যায়।

নারীদের জন্য দরকার পৃথক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট : দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থায় নারী স্বাস্থ্য এখনো গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন গাইনি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার।

বিএমইউয়ের গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘নারীদের জন্য আলাদা অসংখ্য রোগ আছে। সেই বিবেচনায় আলাদা স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হলে চিকিৎসাসেবা যেমন গুরুত্ব পাবে, তেমনি গবেষণাও বাড়বে। আমাদের মায়েরা অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকবেন। দেশে মেডিসিন ও সার্জারির বিভিন্ন বিষয়ে ১৮টি ইনস্টিটিউট গড়ে উঠেছে। কিন্তু নারী স্বাস্থ্যের জন্য আজও কোনো ইনস্টিটিউট হয়নি।’

বিএমআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো মেয়েদের চিকিৎসা নিতে গেলে অনেক প্রতিবন্ধকতা আসে। সামাজিক ট্যাবু, আর্থিক সংকট এবং চিকিৎসাসেবার অভাব তাদের চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তাই প্রয়োজন একটি এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে নারীরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন, যেখানে থাকবে নারী চিকিৎসক, নারীদের জন্য উপযোগী প্রযুক্তি ও পরিষেবা।’