দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষকে নতুন বাংলাদেশের গল্প শোনালেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা হাসনাত আবদুল্লাহ। জাতীয় স্বার্থে দলমত ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এ বাংলাদেশকে কেন্দ্রবিন্দু করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে স্থান হবে না ‘মিডনাইট ইলেকশন’ কিংবা ‘আমি ভার্সেস তুমি’ ইলেকশনের।
দেশের রাজনীতির মূল আলোচনায় থাকা ‘বিচার, সংস্কার এবং আগামী নির্বাচন’ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি কী ভাবছে সেটা জনগণকে জানানো, মানুষের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে ধারণা নিতে গতকাল রবিবার সকাল থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলায় পথসভা কর্মসূচিতে অংশ নেন হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে দলের বেশ কজন কেন্দ্রীয় নেতা। এ কর্মসূচি ঘিরে একশ্রেণির মানুষের মধ্যে কৌতূহলও ছিল। যে কারণে পথসভার স্পটগুলোতে দলীয় কর্মীদের পাশাপাশি বেশ কিছু সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও দেখা গেছে। সকালে নগরীর ষোলশহর বিপ্লব উদ্যান থেকে গাড়িবহর নিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন এবং কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক এলাকায় প্রথম পথসভায় বক্তব্য রাখেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
এ ছাড়া আনোয়ারার চাতরী চৌমুহনী, বাঁশখালী উপজেলা চত্বর, সাতকানিয়ার কেরানীহাট, লোহাগাড়ার আমিরাবাদ, দোহাজারী পৌরসভা চত্বর, চন্দনাইশ পৌরসভা চত্বর, পটিয়া কলেজ গেট ও বোয়ালখালীর ফুলতল এলাকায় পথসভা করেন এনসিপি নেতারা।
মইজ্জারটেকের পথসভায় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমরা আপনাদের কাছে নতুন বাংলাদেশের বার্তা নিয়ে এসেছি। অতীতে যে বৈষম্যমূলক বাংলাদেশ ছিল সেটার ঊর্ধ্বে উঠে আমরা একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলব। আমরা আপনাদের নতুন বাংলাদেশের গল্প শোনাতে চাই। আপনাদের নিয়ে যে নতুন বাংলাদেশ আমরা গড়ব, সেখানে রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে আমরা জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসতে পারব।
নতুন বাংলাদেশে অতীতের মতো পুলিশকে কেউ লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশের ওপর অনেকে বিরক্ত। কিন্তু পুলিশকে কারা ব্যবহার করেছে তাদের নিয়ে কেউ কথা বলে না। পুলিশের প্রমোশন নিয়ে কেউ কথা বলে না, পুলিশের যে অমানবিক পরিশ্রম সেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। পুলিশে সংস্কার নিয়ে কেউ কথা বলে না। তিনি বলেন, আমরা সংস্কার নিয়ে কথা বলছি। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে পুলিশকে আর কেউ লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। আমরা এমন একটা বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে প্রশাসনকে আর কেউ লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে ওসিকে আর ইউএনওকে দাঁড়িয়ে রেখে স্বাক্ষর নিয়ে কোনো মিডনাইট ইলেকশন করতে দিতে হবে না। কোনো ‘আমি ভার্সেস ডামি’ ইলেকশন করতে হবে না। এ সময় সরকারি কর্মকর্তা আর কর্মচারীদের উদ্দেশ্য করে জুলাই অভ্যুত্থানের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আপনারা কোনো সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে নিজেদের দাঁড় করবেন না। আপনারা ৫ আগস্ট যেভাবে জনগণের কাতারে নেমে এসেছেন, সেভাবে আগামীতে আমাদের একসঙ্গে পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন হলেও লড়াই শেষ হয়নি জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম ৫ আগস্ট আমাদের এ লড়াই সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, একটা পক্ষ সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। একটা পক্ষ আবার দেশটাকে বিভাজনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।’ এ পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক ছোট ছোট মতপার্থক্যকে জাতীয় স্বার্থে দূরে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের দেশটাকে গড়তে হবে।
পথসভার বক্তৃতায় অবিলম্বে বিচার কার্যক্রম, সংস্কার কার্যক্রম ও নির্বাচনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ জাতির সামনে প্রকাশ করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান হাসনাত আবদুল্লাহ।
পথসভা কর্মসূচিতে অন্যদের মধ্যে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, মীর আরশাদুল হক, যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ডা. মাহমুদা আলম মিতু, মো. আতাউল্লাহ, সংগঠক আরমান হোসাইন, আজিজুর রহমান রিজভী, যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ইমন সৈয়দ, চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক আরিফ মঈনুদ্দিনসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বাঁশখালী উপজেলা পরিষদ মাঠে গতকাল দুপুরে অনুষ্ঠিত পথসভায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমরা যখন চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এ পথসভা করছি তখনি সচিবালয়ে একটি গ্রুপ অস্থিরতা তৈরির চক্রান্ত করছে। এদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভুলে যাবেন না, আপনারা নিজেদের বিকল্পহীন মনে করবেন না। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা হাজার হাজার ছাত্র বেকার আছে। আপনাদের জায়গায় তাদের বসানোর ব্যবস্থা করা হবে। কোনো ধরনের বিভ্রান্তি না করে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হাসিনা সরকার আর আসবে না। হাসিনার বিকল্প জনগণ খুঁজে নিয়েছে। সব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকারকে সফল করার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকারকে বিতর্কিত করতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে। গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। সব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকারকে সফল করতে হবে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম এ সমন্বয়ক আরও বলেন, বাংলাদেশে আর কখনো হাসিনার সরকার ফিরবে না। গণমাধ্যমকর্মীদের বলতে চাই, আপনারা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশপন্থি সাংবাদিকতা করুন। বাঁশখালীর প্রধান সড়কটি সংকীর্ণ। সড়কটি চার লেন করতে এনসিপির স্থানীয় নেতৃত্ব কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।