মহান আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন, সৃষ্টির সেরা বানিয়েছেন। মানুষ জ্ঞান অর্জন করে এবং কর্মে লিপ্ত হয়। কারও জ্ঞান সৎকর্মে ব্যবহার হয় আর কারও মন্দকর্মে। সৎকর্মের দ্বারা কীর্তিমান হয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যুগ যুগ ধরে বেঁচে রয়। আর মন্দকর্মের দ্বারা নিন্দিত, কলংকিত ও অপমানিত হয়। মানুষ কর্মের দ্বারাই নিজের অবস্থান তৈরি করে। মানুষের জ্ঞান আল্লাহর আদেশ-নিষেধের আলোকে পরিচালিত করলে মানুষ সফলতা লাভ করে। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মানুষ কী করবে, কী করবে না, কোনটি অপরাধ, কোনটি অপরাধ নয়, সেই বিষয়ে প্রতিটি সমাজ-সভ্যতারই আলাদা আলাদা নীতিমালা রয়েছে। নির্ধারণকৃত নীতিমালার ঊর্ধ্বে গিয়ে কেউ অপরাধে লিপ্ত হলে সামাজিক বিধির আলোকে শাস্তির বিধান রয়েছে। গ্রাম থেকে শুরু করে শহর, নগর, বন্দরে আইন, আদালত, কারাগার রয়েছে। ভালো কাজের পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু এত আইন, আদালত, কারাগার, ভালো কাজের পুরস্কার আর মন্দ কাজের শাস্তির বিধান থাকার পরও আমাদের সমাজ দিন দিন এত অধঃপতন ও অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে কেন?
এর কারণ হচ্ছে, আমাদের সমাজব্যবস্থা আল্লাহ ও তার প্রেরিত রাসুল (সা.)-এর বাতলানো পথ ও পদ্ধতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি মানুষের শান্তি-নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য যত আইনকানুন বা নিয়ম-নীতির প্রয়োজন তা পরিপূর্ণরূপে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কী কাজ করলে মানুষ শাস্তির উপযুক্ত হবে, আর কী কাজ করলে পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে সবই আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব সমাজ বা সভ্যতা স্রষ্টার বিধানের ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজেদের মনগড়া চিন্তা-চেতনার আলোকে বিধান প্রয়োগ করে জীবনযাপন করে, সেসব সমাজ বা সভ্যতায় দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুটপাট ও অরাজকতা। এসব সমাজ অধঃপতন ও অবনতির দিকে ধাবিত হয়। মানুষের তৈরি মনগড়া বিধান দিয়ে দুনিয়ার সফলতা, উঁচু দালান নির্মাণ করা গেলেও মানুষের নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়ন সাধন করে প্রকৃত সফল ও শান্তির সমাজ গঠন করা সম্ভব হয় না।
মহান আল্লাহ দুনিয়াতে লক্ষাধিক নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাদের ওপর আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন। মানুষকে সমাজবদ্ধ হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপনের পথ ও পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ রাসুল (সা.)-এর ওপর মহাগ্রন্থ কোরআন নাজিল করেছেন। তিনি মানুষকে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এই কোরআন জাহান্নামের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে প্রকৃত সফলতার পথ দেখায়। কোরআনের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আরবের জাহেলি সমাজ পরিবর্তন হলো, গড়ে উঠল আদর্শ সমাজব্যবস্থা। জাহেলি যুগের মানুষগুলো সোনার মানুষে পরিণত হলেন। তারা হয়ে গেলেন সাহাবায়ে কেরাম। মহান আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন এবং কোরআনে ঘোষণা করলেন, ‘তাদের জন্য তাদের মালিকের কাছে পুরস্কার রয়েছে এমন এক জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হবে ঝর্ণাধারা, তারা সেখানে অনন্তকাল অবস্থান করবে, আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন, তারাও তার ওপর সন্তুষ্ট হবেন, এই জন্য যে তারা তাদের মালিককে ভয় করেছে।’ (সুরা বাইয়্যেনাহ ৮)
কোরআনের সূচনায় মহান আল্লাহ মানুষকে সফলতার পথে পরিচালিত হওয়ার জন্য সরল সঠিক পথে চলার প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন। সুরা ফাতেহায় তা বর্ণিত হয়েছে। সরল সঠিক পথ হচ্ছে সেই পথ, যে পথের পথিক হয়েছেন নবীগণ, সত্যবাদীগণ, শহীদগণ, পুণ্যবানগণ। এসব মহান মানুষরা যে পথের পথিক হয়েছেন সেই পথটিই হচ্ছে প্রকৃত সফলতার পথ। এ পথের পথিকরাই জান্নাতের অধিবাসী হবেন। যে জ্ঞান আহরণ করলে সরল সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যায় সেই জ্ঞানই হচ্ছে প্রকৃত সফলতার জ্ঞান।
যেই জ্ঞান অর্জন করলে মহান স্রষ্টার কথা স্মরণ হয়, ইমান দৃঢ় হয়, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনে আগ্রহ বাড়ে, ইবাদতে একাগ্রতা আনে, সৎকর্মের প্রতি মন ব্যাকুল হয়ে থাকে, সেই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান। যার জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি আল্লাহর বিধিনিষেধের আলোকে পরিচালিত হয়, সেই প্রকৃত জ্ঞানী। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে, আল্লাহর বিধিবিধানের আলোকে জীবনযাপন করে, আল্লাহকে ভয় করে, নামাজ আদায় করে, স্বীয় জীবিকা থেকে সৎপথে ব্যয় করে, আখেরাতকে বিশ্বাস করে, এসব মহৎ ব্যক্তিদের সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।’ (সুরা বাকারা ৫)
যে জ্ঞান অর্জন করে মানুষ স্রষ্টাকে চিনতে পারে না, যে জ্ঞান স্রষ্টার বিধিনিষেধকে উপেক্ষা করে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করে, পাপিষ্ট শয়তানের প্ররোচনায় জীবনকে গুনাহের কাজে নিমজ্জিত করে, আরাম-আয়েশে মেতে থাকাকে জীবনের উৎকৃষ্ট অর্জন মনে করে, স্রষ্টা কর্র্তৃক নির্ধারিত নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি ফরজ বিধানাবলি ছেড়ে দিতে থাকে, সেই জ্ঞান প্রকৃত জ্ঞান নয়।
মানুষ বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তা-গবেষণা দ্বারা সচেতনভাবেই নানারকম সামাজিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে মানুষ আবিষ্কার করেছে উন্নত থেকে উন্নততর যন্ত্রপাতি। এসবই মহান আল্লাহর নিদর্শন ও অনুগ্রহ। দুর্ভাগ্য সেসব মানুষের জন্য, যারা মহান আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানকে ব্যবহার করে বিজ্ঞানের আশ্চর্যজনক আবিষ্কার করতে পারলেও জ্ঞানের মালিককে চিনতে পারল না। আকাশ, বাতাস, সাগর, পানি, মাটি, বৃক্ষরাজি ইত্যাদি ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় বস্তু ও পণ্যসামগ্রী তৈরি করতে পারলেও এগুলোর প্রকৃত মালিককে চিনতে পারল না। যেই জ্ঞান অর্জন করে স্রষ্টার পরিচয় অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, অন্তরে মহান আল্লাহর প্রতি ভয় সৃষ্টি হয় না, সেই জ্ঞান কিঞ্চিৎ দুনিয়ার সফলতার জ্ঞান হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সফলতার জ্ঞান হতে পারে না।
কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।’ (সুরা ফাতির ২৮) এই আয়াতে প্রকৃত জ্ঞানী বলতে সেসব ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যারা জ্ঞান অর্জন করে মহান আল্লাহর পরিচয় লাভ করেছেন এবং মহান আল্লাহর কুদরত, নেয়ামত ও বিধানাবলি সম্পর্কে অবগত ও সচেতন। মহান আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলির জ্ঞান যখন পূর্ণ হয় তখন মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয় সৃষ্টি হয়। এর ফলে সে চুরি করে না। দুর্নীতি করে না। মাদক সেবন করে না। খুন, সন্ত্রাস, রাহাজানি করে না। কোনো ধরনের পাপাচারে লিপ্ত হয় না। মিথ্যা বলে না। সত্যাশ্রয়ী হয়। হয় প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী খাঁটি মানুষ।
আল্লামা শেখ সাদি (রহ.) বলেন, ‘তুমি সত্যবাদী, জ্ঞানের সাধক এবং পাপকে ঘৃণা করো। তুমি যেকোনো কাজই করো না কেন, বিশ্বাস করো, তোমার মর্যাদা অল্প নয়। তুমিই যথার্থ ধার্মিক। তুমিই প্রকৃত সফল।’
মানুষের জীবন খুবই সীমিত সময়ের। দুনিয়া মানুষের চিরস্থায়ী ঠিকানা নয়। মরণ একদিন মুছে দেবে রঙিন পরিচয়। ক্ষমতাধরের ক্ষমতা মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, যখন মৃত্যু দুয়ারে এসে হাঁক দেবে। রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, সবল-দুর্বল কেউই মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারবে না। অতিথি পাখির মতো পৃথিবীতে এসে পরকালের দিকে চলে যেতে হয়। সীমিত সময়ের জীবনের কর্ম দিয়ে অনন্তকালীন জীবনের সুখ-শান্তি অর্জন করে নিতে হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতে পুঁজি অর্জনের জায়গা।’