বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবায় (এমএফএস) গ্রাহকদের বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় ৭ থেকে ১৫ গুণ বেশি সেবামূল্য গুনতে হচ্ছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও এসব সেবার মূল্য কয়েকগুণ বেশি। এ ছাড়া গ্রাহককে এমন কিছু সেবার মূল্য দিতে হচ্ছে, যা অন্যান্য দেশে নেই। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে সংস্থাটির আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) খাতে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে টিআইবি জানিয়েছে, উদ্যোক্তা, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ত্রিমুখী আঁতাতের মাধ্যমে নীতি নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে এমএফএস খাতকে কুক্ষিগত করা হয়েছে। এর ফলে জনগণকে আর্থিকভাবে শোষণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারও হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে এমএফএসের মাধ্যমে ৫.৫ লাখ কোটি টাকার ‘ক্যাশআউট’ লেনদেনে গ্রাহকদের কাছ থেকে সেবামূল্য বাবদ আদায় করা হয়েছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি থেকে ১০ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা পর্যন্ত। যেখানে একই পরিমাণ নগদ উত্তোলনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিয়েছে মাত্র ৬৩৯ কোটি টাকা।
এমএফএস সেবামূল্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে। বিকাশ থেকে ২৫ হাজার টাকা উত্তোলনে ৩৭২.৫ থেকে ৪৬২.৫ টাকা চার্জ নেওয়া হয়, যেখানে পাকিস্তানে (ইজি পয়সা) ৩৫৫.৭, মিয়ানমারে (ওয়েভ পে) ২৩১.৩ এবং ভারতে (ফোন পে) একই সেবা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ব্যক্তিগত এমএফএস হিসাবধারীদের ৬.৩ শতাংশ, এজেন্টদের ১৭ শতাংশ এবং মার্চেন্টদের ১.৬ শতাংশ জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩.৭৬ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে বিকাশ ও নগদ দুটি প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তিগত হিসাবের প্রায় ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে প্রতিযোগিতা সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং বাজারে সুষ্ঠু বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষভাবে নগদ লিমিটেডের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ট্রাস্ট ফান্ডের সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি তৈরি করেছে, যা গ্রাহক অর্থের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, নগদ লিমিটেড ভাতা ও উপবৃত্তির অর্থ বিতরণের সুবিধা নিয়ে অনিয়ম করেছে এবং প্রায় ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা বেনামি শেয়ারহোল্ডারের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছে। একই সঙ্গে ‘বিনিময়’ প্ল্যাটফর্মেও নীতিবহির্ভূত কার্যক্রম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এমএফএস খাত করায়ত্ত করার জন্য রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় নীতিকাঠামো ও আইনি দুর্বলতার অপব্যবহার করা হয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে নগদকে অনৈতিক সুযোগ দেওয়ার এবং তার মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহলের সুবিধা অর্জনের জন্য এ গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বিনষ্ট করা হয়েছে। আবার নীতিকাঠামোর দুর্বলতার কারণে এ খাতে আমরা একদিকে যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া বাজার দেখছি, অন্যদিকে নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তির নামে এ অন্তর্ভুক্তির সুফল থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সেবামূল্য নির্ধারণের এখতিয়ার এককভাবে এমএফএসপির হাতে ন্যস্ত থাকায় স্বাভাবিক ব্যাংক খাতের তুলনায় অনেক বেশি সেবামূল্য দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের, যার বোঝা বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী এবং অন্য সুবিধাবঞ্চিতদের তুলনামূলক বেশি বইতে হচ্ছে। সেবামূল্যের এই উচ্চহার, যা আন্তর্জাতিক মানদ-েও অস্বাভাবিক, এ বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই। গ্রাহকের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে পুরো খাত ঢেলে সাজাতে হবে।
ঘুষ, অর্থ পাচার, অনলাইন জুয়া, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে এমএফএস ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমাদের বৈদেশিক রেমিট্যান্সের যে রেকর্ড বৃদ্ধি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ এমএফএস ব্যবহার করে অবৈধ হুন্ডি লেনদেন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। যদিও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কারণে নয়, এ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে এমএফএস ব্যবহার করে অর্থ পাচারে জড়িত অপশক্তির পতনের ফলে। এ দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ পরিবর্তনকে স্থায়িত্ব দিতে উদ্যোগী হবে বলে আমরা আশা করি। পাশাপাশি, আগে যে সরাসরি ঘুষ নেওয়ার প্রবণতা ছিল, এখন তা এমএফএসের মাধ্যমে করার সুযোগ হয়েছে। তাই এমএফএস খাতকে আয়করের আওতায় আনতে হবে। এর ফলে বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আয়, করফাঁকি এবং ঘুষ লেনদেনের বিষয়সমূহ চিহ্নিত করা যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ নূরে আলম এবং রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাজী আমিনুল হাসান। টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন।