চট্টগ্রাম শহরে হঠাৎ পার্বত্য এলাকার সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) পোশাক জব্দের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। গত ২৫ দিনে (৩ থেকে ২৭ মে) নগরের দুটি পোশাক কারখানা, গুদাম ও একটি ভবন থেকে তিনটি পৃথক অভিযানে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব অভিযানে কেএনএফ’র ৪৭ হাজার ৮৫টি পোশাক জব্দের পাশাপাশি ৩১৫ ফুট দৈর্ঘ্যের কাপড় (কেএনএফ পোশাকের) জব্দ করে পুলিশ।
কেএনএফ’র পোশাক জব্দের বিষয়টি প্রথম সামনে আসে চলতি মাসের ২ তারিখ। সেদিন বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে নগরের অক্সিজেন পশ্চিম শহীদ নগর তৈয়বিয়া হাউজিং সোসাইটির জনৈক জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন ভবনের চারতলার ১নং কক্ষ থেকে মো. সুরুজ্জামান মিয়া (৪২) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় পুলিশ সুরুজ্জামানের হেফাজত থেকে ৩১৫ ফুট দৈর্ঘ্যের থান কাপড় (কেএনএফ সিলযুক্ত) জব্দ করে।
সুরুজ্জামান মিয়া টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থানাধীন চৌকা হাদিয়া ফকির বাড়ির মৃত আবুল কাশেমের ছেলে। গত ৩ মে তাকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত তাকে (সুরুজ্জামান) পাঁচদিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। রিমান্ড শেষে ১৩ মে তাকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। সেদিনই আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন সুরুজ্জামান।
কেএনএফ’র পোশাক জব্দের ঘটনা চট্টগ্রাম নগর পুলিশের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেশ অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমকে অনেকটা এড়িয়ে চলছে নগর পুলিশ। বক্তব্য জানতে বুধবার (২৮ মে) বিকেলে নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ, সিএমপির মিডিয়া অফিসার এডিসি মাহমুদা বেগম, ডিসি ক্রাইম রইছ উদ্দিন এবং বায়েজিদ থানার ওসি মো. কামরুজ্জামানকে একাধিকবার কল করা হলেও তারা কেউই সাড়া দেননি।
পোশাক তৈরির জন্য কেএনএফ চট্টগ্রাম শহরকে কেন বেছে নিল? পাবর্ত্য এলাকা ছাপিয়ে কেএনএফ চট্টগ্রামে সাংগঠনিক শক্তি ও লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়াতে চায় কিনা সেই প্রশ্নও উঠেছে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, “কেএনএফ শুধু পাহাড়ে নয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ শহরাঞ্চলেও সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ার অপচেষ্টা করছে। তারা এখন অর্থ, অস্ত্র, পোশাক জোগাড় করতে চায়। এখানে শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত কেএনএফ।”
কেএনএফ’র উত্থান এবং চট্টগ্রাম শহরে তাদের ইউনিফর্ম তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী। গত এক মাসে কেএনএফ’র ১ হাজার ৯৭৯ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত এই সংখ্যা ১৪ হাজারের অধিক। গত সোমবার (২৬ মে) সেনা সদরে আয়োজিত বিশেষ ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানায় সেনাবাহিনী।
সবশেষ মঙ্গলবার (২৭ মে) রাতে নগরের পাহাড়তলী থানার একটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে ১৫ হাজার ইউনিফর্ম জব্দ করে পুলিশ। এ ঘটনায় পাহাড়তলী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। অভিযানে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে সোমবার (২৬ মে) রাতে একই থানার পুলিশ নগরের নয়াহাট এলাকার একটি গুদাম থেকে ১১ হাজার ৭৮৫ পিস ইউনিফর্ম জব্দ করে।
গত ১৭ মে রাতে নয়াহাটে অবস্থিত ‘রিংভো অ্যাপারেলস’ কারখানা থেকে ২০ হাজার ৩০০টি ইউনিফর্ম জব্দ করেছিল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় কারখানা মালিক সাহেদুল ইসলাম, মো. গোলাম আজম ও নিয়াজ হায়দারকে। আজম ও নিয়াজ পোশাক তৈরির অর্ডার এনেছিলেন। সাহেদুল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার খাগড়িয়া আমিরখিল এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে, মো. গোলাম আজমের বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকায়। নিয়াজের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায়। এই তিনজনকে দুই দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে পুলিশ।
পুলিশের নথি থেকে জানা যায়, পোশাক সরবরাহের নির্দেশ এসেছিল কেএনএফ-এর এক সদস্য মংহ্লাসিন মারমা ওরফে ‘মং’-এর কাছ থেকে। প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে এই কাজ হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে। এদিকে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী ও বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকায় পৃথক তিনটি অভিযানে কেএনএফ’র প্রায় অর্ধলাখ পোশাক জব্দ করলেও বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ কেন নিশ্চুপ তা নিয়ে রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। তবে পুলিশের তরফ থেকে ঘটনাটি ‘সাইলেন্ট’ রাখতে বলা হলেও পরে তথ্য ফাঁস হয়ে যায়।
জানা গেছে, বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলায় সক্রিয় কেএনএফ গত এক বছরে একাধিক বার সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র ব্যবসা, এবং জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার সঙ্গে যৌথ ট্রেনিং ক্যাম্প পরিচালনার অভিযোগ আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, সম্প্রতি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে কেএনএফ’র দূরত্ব তৈরি হলেও নতুনভাবে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও লজিস্টিক সক্ষমতা গড়ে তুলছে তারা। আর এবার তারা সরাসরি চট্টগ্রামের মতো বাণিজ্যিক শহরকে তাদের সাপ্লাই চেইনের অংশ বানানোর চেষ্টা করছে।
২০২২ সালে পার্বত্য এলাকায় জঙ্গি বিরোধী একটি সমন্বিত অভিযান চালিয়েছিল নিরাপত্তা বাহিনী। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) এমদাদুল ইসলামের। এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক কেএনএফের শক্তি ও সমর্থন খুব একটা আছে তেমন মনে করেন না। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) এমদাদুল ইসলাম বলেন, “আমার মনে হয় যথাযথ গুরুত্ব না দেয়ায় তারা একটু বড় হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। পরে জঙ্গি ইস্যুটি সামনে আসার পর কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেছে।”