দেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই বিষণ্নতায় ভুগছে। তাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই আঘাতজনিত মানসিক ব্যাধিতে (পোস্ট ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) আক্রান্ত। পৃথিবীর অন্যতম নৃশংস রুয়ান্ডা গণহত্যার সার্ভারভাইদের তুলনায় এ হার প্রায় দেড় গুণ বেশি। এ ছাড়া বিষণ্নতায় আক্রান্তের হারও রুয়ান্ডার তুলনায় দ্বিগুণ।
গত ১৮ মে পিয়ার রিভিউড মেডিকেল জার্নাল কিউরিয়াসে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ), ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও পাবনা মানসিক হাসপাতালের একদল গবেষক গবেষণাটি পরিচালনা করেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১৭ জন আহতের ওপর এই গবেষণা করা হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া আহতদের মধ্যে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৭৫, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) ৬৫ এবং বিএমইউতে ৭৭ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
গবেষণায় বলা হয়, আহতদের ৪৮ শতাংশের বয়স ছিল ২০-২৯ বছরের মধ্যে এবং ২৫ শতাংশের ২০ বছরের নিচে বয়স। আহতদের ৯৭ শতাংশ ছিল পুরুষ। তাদের মধ্যে শহরাঞ্চলের বাসিন্দা ছিল ৫৬ শতাংশ ও বাকি ৪৪ শতাংশ গ্রামের।
এ ছাড়া আহতদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ও বাকি ৬২ শতাংশ অন্যান্য পেশার সাধারণ মানুষ ছিল।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশই ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ও ১২ শতাংশ উচ্চবিত্ত শ্রেণির।
আহতদের মধ্যে ৮৯ শতাংশই গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে। আহতদের ৮১ শতাংশ দ্রুত চিকিৎসা পেলেও ১০ শতাংশের চিকিৎসা পেতে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বিষণ্নতা ও পিটিএসডির হার বিপজ্জনকভাবে বেশি, যথাক্রমে ৮২ ও ৬৪ শতাংশ। অথচ বিশ্বের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী-সহিংসতার গবেষণায় বিষণ্নতার হার ৪৯ শতাংশ ও পিটিএসডির হার ৪-৪১ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। রুয়ান্ডার গণহত্যার জীবিতদের মধ্যে পিটিএসডি ও বিষণ্নতা ছিল ৪৬ শতাংশ করে।
এ ছাড়া বিষণ্নতায় আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর ২০ শতাংশ ও মাঝারি গুরুতর ৩৬ শতাংশ। আর পিটিএসডি আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর ৪ শতাংশ ও মাঝারি গুরুতর ২০ শতাংশ। গবেষণায় এমন তথ্যও উঠে এসেছে, আহতদের মানসিক স্বাস্থ্য শহরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ। গ্রামাঞ্চলের আহতদের মধ্যে বিষণ্নতা ও পিটিএসডির সম্ভাবনা শহরের তুলনায় বেশি। পিটিএসডি আক্রান্তদের ৯৯ শতাংশ বিষণ্নতায়ও আক্রান্ত ছিলেন। আর বিষণ্নতায় আক্রান্তদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ পিটিএসডিতেও আক্রান্ত।
এত বেশি মানসিক প্রভাবের পেছনে প্রাণঘাতী আঘাত, স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, সহযোদ্ধাদের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা এবং মানসিক প্রস্তুতির অভাব অনুঘটক হিসেবে রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া যাদের আঘাত বেশি ছিল, তারা দ্রুত চিকিৎসা নিয়েছেন এই গুরুতর ট্রমা-অভিজ্ঞতা পিটিএসডি বাড়িয়ে দিতে পারে। পিটিএসডি হওয়ার প্রধান কারণ হলো ট্রমার তীব্রতা, সামাজিক সহায়তার অভাব ও চলমান জীবনের চাপ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনের আহতদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অত্যন্ত গুরুতর এবং তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনে বেঁচে যাওয়া আহতদের মধ্যে বিষণ্নতা এবং পিটিএসডির লক্ষণ লক্ষ করার মতো মাত্রায় বিদ্যমান। ভবিষ্যতে এই ব্যক্তিদের মধ্যে তীব্র বিষণ্নতা, আত্মহত্যার ঝুঁকি, সহিংস আচরণ বা হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা এবং মাদকাসক্তির মতো জটিল মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। গবেষণাটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও সমানভাবে জরুরি এবং অবহেলা করলে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।
এ ব্যাপারে গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান বলেন, পিটিএসডি এবং ডিপ্রেশন দুটোতেই আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, নিজেকে ক্ষতি করা বা অন্যকে ক্ষতি করার প্রবণতা বেড়ে যায়। এরা আসলে এমন একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে ভবিষ্যতে যদি এদের মানসিক সমস্যাকে অ্যাড্রেস না করা হয় এবং সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাবে। এজন্য এ ধরনের রোগীদের আত্মহত্যার ঝুঁকি অনেক বেশি।
এই গবেষক আরও বলেন, এটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ট্রমা বেইজড চিকিৎসা, সাইকোথেরাপিসহ নানা ধরনের চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। যারা হাসপাতালে ভর্তি নেই, কিন্তু আহত হয়েছেন, তাদেরও চিকিৎসা করা দরকার। এ ছাড়া যারা এই ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করেছে, তাদেরও চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।