চার দিন ধরে বন্ধ জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। এটি দেশের চক্ষু রোগের চিকিৎসার একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। এ সময় হাসপাতালে আসেননি কোনো চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা। মূল ফটকে তালা। সব ধরনের সেবা বন্ধ। শুধু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিছু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতরা ছাড়া পুরো হাসপাতাল এখন ভুতুড়ে রূপ নিয়েছে।
গত বুধবার চিকিৎসাধীন জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় জুলাই যোদ্ধাদের হামলায় ১৫ চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী মারাত্মক আহত হন। পরে ভয় ও আতঙ্কে হাসপাতাল ত্যাগ করেন চিকিৎসক, নার্সসহ হাসপাতালের সব স্বাস্থ্যকর্মী। ভয়ে হাসপাতাল ছাড়ে চিকিৎসাধীন দুই শতাধিক সাধারণ রোগী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। মূল ফটকে তালা দেওয়া হয়। সেই থেকে গতকাল পর্যন্ত এই হাসপাতাল বন্ধ রয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, বাংলাদেশে কোনো সংঘর্ষের ঘটনায় পুরো হাসপাতাল বন্ধ থাকার ঘটনা এটাই প্রথম। এর আগে কখনোই কোনো সরকারি হাসপাতাল এভাবে বন্ধ রাখা হয়নি।
চার দিন পর গতকাল প্রথমবারের মতো হাসপাতাল বন্ধের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে সেখানে কবে নাগাদ হাসপাতাল চালু হবে এবং ভয়ে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়া চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগের কথা জানানো হয়নি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের পাঠানো মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে বলা হয়েছে, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকসহ অন্য সেবাদানকারীরা গত ২৮ মে হাসপাতাল অভ্যন্তরে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। দুর্ভাগ্যজনক এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সব সেবাদানকারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বিধায় গত ২৮ মে থেকে ওই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি অধিকাংশ রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করেন। বর্তমানে শুধু জুলাই যোদ্ধারাই হাসপাতালে অবস্থান করছেন। সব সেবা বন্ধ থাকলেও জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় তাদের পথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ‘এই পরিস্থিতিতে সারা দেশ থেকে আসা চক্ষু রোগীদের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমরা সেবাবঞ্চিত সব রোগীর প্রতি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি।’
বক্তব্যে বলা হয়, ‘অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছে। প্রতিনিধিদল আহতদের সঙ্গে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ অন্য সেবাদানকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা করছেন। এই মুহূর্তে আমরা আলোচনার একটি ইতিবাচক ফলাফলের প্রত্যাশায় আছি।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, চিকিৎসাসেবার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত হলেই ওই হাসপাতালের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা আবার চালু করার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ সময় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে চক্ষু চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এমন রোগীদের নিকটস্থ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্য পাঠানোর পর গতকাল রাত পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা আহত যোদ্ধাদের সঙ্গে ঠিক কী আলোচনা করলেন এবং হাসপাতাল খোলার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
উল্টো জুলাই আহত যোদ্ধারা হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বাসায় হামলা করবে এমন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, গতকাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাই যোদ্ধাদের পথ্য দিতে গেলে তারা কিছু চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ির ঠিকানা জানতে চেয়েছেন। এতে চিকিৎসকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, আহত যোদ্ধারা ১১ চিকিৎসক ও পাঁচজন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর তালিকা তৈরি করেছেন। তারা এসব চিকিৎসবক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের হাসপাতাল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল হাসপাতালের ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম। তবে তিনি শুক্রবার বলেছিলেন, ভয় ও আতঙ্কে চিকিৎসক, নার্সসহ কোনো স্বাস্থ্যকর্মী হাসপাতালে যেতে পারছেন না। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রোগীরাও চলে গেছে। তবে জুলাইয়ের আহতদের একটি অংশ এখনো অবস্থান করছে।
চিকিৎসকরা জানান, নানা দাবিতে গত বুধবার বেলা ১১টার দিকে হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরীর কক্ষে ভাঙচুরের পর চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা করে আহতদের একাংশ। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করলে সেখানেও হামলা করা হয়। এ ঘটনায় ১৫ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আহত হন।
সেদিন সংঘর্ষের পর হাসপাতালে ভর্তি দুই শতাধিক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। এ ছাড়া চিকিৎসক-নার্সদের হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার পর হাসপাতাল কোয়ার্টারে আটকে পড়েছিলেন চার পরিবারের সদস্যরা। পরে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে গত রবিবার হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে বিষপান করেন চার আহত তরুণ। এরপর গত মঙ্গলবার পরিচালককে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে গায়ে পেট্রোল ও কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান জুলাই আহত যোদ্ধারা। পরদিন বুধবার চিকিৎসক, নার্সসহ হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা করেন তারা। সেদিনই ভয়ে ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান সব চিকিৎসক, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মী। গতকাল পর্যন্ত তারা হাসপাতালে আসেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে প্রয়োজনে তারা চাকরি ছেড়ে দেবেন। তবুও ওই হাসপাতালে আর যাবেন না।
এর আগে এসব ঘটনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালকের দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের চৌধুরী। পরে তাকে সাত দিনের ছুটি দেওয়া হয়। তার স্থানে ডা. জানে আলমকে ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।