বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু ভালো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বৈষম্যবিহীন সমাজ গড়ার যে দর্শন, এর সঙ্গে বাস্তবে নেওয়া পদক্ষেপগুলো সব ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সিপিডি আরও বলেছে, বাজেটে কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন নেই। একই কাঠামোর মধ্যে এখানে একটু বেশি, ওখানে একটু কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার অর্থ উপদেষ্টা টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। এই বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেছে সিপিডি। সিপিডি কার্যালয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় ফাহমিদা খাতুন বলেন, কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগটি এখানে রয়ে গেছে। এখানে রেট বাড়ানো হয়েছে। বারবার এ সুযোগ দেওয়ার পরও কিন্তু কালো টাকার আদায় খুব বেশি নেই। আসলে এটা আদায় করার জন্য সরকারের ইচ্ছা এবং যে ধরনের ড্রাইভ দরকার, সেটা নেই। এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে এক-দুবার এই সুযোগ দিয়ে চিরতরে এই সুবিধা বন্ধ করতে হবে। কারণ যারা ঠিকভাবে আয় করে, নীতি মেনে কর দেয়, তারা কিন্তু ডিমোরালাইজড হয়ে পড়ে এসব পদক্ষেপে। এটা বৈষম্যও তৈরি করে।
এ ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে কর রেয়াত, করের হার কমানোর মতো কিছু সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা এবং কর্মসূচি কমানো হয়েছে। আগে যেখানে ১৪০টির মতো কর্মসূচি চলত, এখন সেটা কমিয়ে ৯৫টি করা হয়েছে এবং অর্থ বরাদ্দও কমানো হয়েছে। এবার বরাদ্দ ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু এখানে বরাবরের মতো কিছু খাত যুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো উচিত নয়। কারণ এটি একেবারেই অতি দরিদ্র মানুষের জন্য।
এখানে আছে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, কৃষি ভর্তুকি আছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এই দুটো মিলে যে ৫২ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ, সেটি বাদ দিলে কিন্তু থাকে ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এটি প্রকৃত অর্থে অনেক কম। এভাবে বরাদ্দ দিলে বোঝা যাবে আসলে দরিদ্র মানুষের জন্য কী করা হলো।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, কাঠামোগতভাবে বাজেটের আকার সামান্য ছোট করা হয়েছে। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও (এডিবি) কিছুটা কাটছাঁট করা হয়েছে। সেটার একটা কারণ হচ্ছে, চলমান অর্থনীতির যে সংকট অর্থাৎ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সমস্যা এবং সর্বোপরি কম রাজস্ব আহরণের সমস্যা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা বাজেটটা উপস্থাপন করেছেন।
আগামী অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যেটা কি না জিডিপির ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এটা বড় উল্লম্ফন, কারণ বিগত সময়ে লক্ষ্যমাত্রাগুলোই বাস্তবায়ন করা যায়নি।
সিপিডি বলছে, এডিবির লক্ষ্যমাত্রা ১৩ দশমিক ২ শতাংশ কমানো হয়েছে। ১৫টি খাতের মধ্যে ১৪টি খাতেই কিন্তু কমানো হয়েছে। চিন্তার বিষয় হচ্ছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষিÑ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি খাতে এডিপিতে টাকার অঙ্ক কমানো হয়েছে।
এ ছাড়া করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোকে সিপিডি সাধুবাদ জানিয়েছে। করের সø্যাবগুলো পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে করে নিম্ন-মধ্যম আয়ের যারা, তাদের ওপরই এর হারটা বেশি পড়বে। আবার যারা উচ্চ আয়ের, তাদের ক্ষেত্রে অনেক কম পড়বে। সেখানে একটা বৈষম্য দেখা গেছে।
সিপিডি আরও বলছে, শুল্ক যৌক্তিকীকরণ করতে গিয়ে অনেক আমদানি পণ্যের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এতে করে কিছু কিছু শিল্প চাপে পড়তে পারে। কারণ মূল্যস্ফীতি বেশি, ব্যবসার খরচ বেশি। এটাকে যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। যখন দেশ স্বল্পোন্নত হবে, তখন এটা রেশনালাইজ করতে হবে। কিন্তু এই খাত মোকাবিলার ক্ষেত্রে ব্যবসার খরচ কমাতে হবে, বিদ্যুৎ-জ¦ালানির দাম সাশ্রয়ী করতে হবে। রাজস্ব জিডিপির রেশিং লক্ষ্যমাত্রা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত কম বলছে সিপিডি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আগামী অর্থবছরের জন্য এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ শতাংশ। আগামী ১০ বছর পর যখন আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব, তখন মাত্র দেড় শতাংশ প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির লক্ষ্য, এটা আকাক্সক্ষার নিম্নগামী।’
এ ছাড়া বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ই-কমার্সে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এটাকে একটা ফরমাল সেক্টরে আনার জন্য যে পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, করের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে, এগুলো ইতিবাচক। এ ছাড়া পিপিপি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের অধীনে যে ৫ হাজার ৪০ কোটি টাকার ফান্ড গঠন করা হয়েছে, এটা ভালো পদক্ষেপ। আগেও এই মডেলে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু সেগুলো খুব বেশি এগোয়নি। সেখানে দেখা গেছে, সরকারের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একটু পিছিয়ে যায়, আবার প্রাইভেট সেক্টর খুব দ্রুত এগোতে চায়। দুটোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। আর এই টাকার ব্যবহার যাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে হয়।