আমদানি-রপ্তানি ও বন্ড ব্যবস্থাকে সহজীকরণ ও ব্যবসাবান্ধব করার উদ্দেশ্যে সংশোধনী তৈরি পোশাক রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করবে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ-এর প্রশাসক আনোয়ার হোসেন। একইসঙ্গে তিনি প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
গতকাল সোমবার অর্থ উপদেষ্টা ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট উত্থাপনপরবর্তী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন। তবে পোশাকশিল্পের সুরক্ষায় বিজিএমইএ আরও কিছু প্রস্তাবনা ছিল, যা ঘোষিত বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। তবে চূড়ান্ত বাজেটে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে আশা করছে বিজিএমইএ।
আনোয়ার হোসেন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ভিন্ন বাস্তবতায় বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয় শীর্ষক ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাবনা করা হয়েছে।
তিনি মনে করেন, ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে লক্ষ্যবিলাসী ধারণা থেকে সরে এসে সামগ্রিক উন্নয়ন, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, নাগরিক সুবিধা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পাশাপাশি চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ প্রভৃতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ মনে করে, এগুলো বাজেটের অনন্য দিক।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে পোশাককর্মীসহ দেশের স্বল্প আয়ের মানুষ উপকৃত হবেন। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতায় কিছু কর্মসূচিতে ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমানোর লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সার্বিক ব্যয় ১০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামীতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এটি শিল্পের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ।
এলএনজির আমদানিপর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোলিয়াম ও ডিজেলের আমদানি শুল্কও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে। আমরা মনে করি, ভোক্তাপর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাবে এবং প্রত্যক্ষভাবে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমবে। সর্বোপরি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ১২৫ কোটি টাকার তহবিল গঠন, ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য গবেষণা বাবদ ২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ এগুলোকে স্বাগত জানায়।
এবারের বাজেট পোশাকশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যাশাপূর্ণ। কারণ বর্তমানে বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক, ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল, উচ্চ ব্যাংকসুদ, মজুরি বৃদ্ধি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘন ঘন মূল্যবৃদ্ধির চাপে শিল্পটি পিষ্ট। আবার অন্যদিকে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যুক্ত হচ্ছে। এতে করে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে রপ্তানিতে ৮৪ শতাংশ অবদান রাখা পোশাকশিল্প। এ প্রেক্ষিতে বর্তমানে শিল্পের বিরাজমান সমস্যাগুলো মোকাবিলা এবং গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী সময়ে শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখার বিজিএমইএ-এর পক্ষ থেকে বেশ কিছু বাজেট প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।
ঘোষিত বাজেটে রপ্তানির বিপরীতে উৎসে কর এবং শিল্পে করপোরেট কর অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বিজিএমইএ একে সাধুবাদ জানায়।
বিজিএমইএ অনুরোধে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া এবং বন্ড ব্যবস্থাকে সহজীকরণ ও ব্যবসাবান্ধব করার উদ্দেশ্যে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে, তা তৈরি পোশাক রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আরজেএসসি বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা কর্তৃক অনুমোদনের অনধিক ২ মাসের মধ্যে বন্ড কমিশনারেটে আবেদন দাখিল করতে উল্লেখ করা হয়েছে;
বিগত ৩ বছরের মধ্যে ২ বছরের নিরীক্ষা সম্পন্ন থাকলে ৩ বছর মেয়াদি জেনারেল বন্ড নবায়ন করা যাবে; এফওসি ভিত্তিতে রিভলভিং পদ্ধতিতে কাঁচামাল আমদানির কার্যক্রম সহজীকরণে কিছু শর্ত বাদ ও সংশোধন করা হয়েছে। অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের পরিবর্তে রাজস্ব কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা জরিপের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; ন্যায়নির্ণয়, শুল্কায়ন, গোয়েন্দা কার্যক্রমসহ নানাবিধ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কমিশনার অব কাস্টমস- এর ওপর অর্পিত দায়িত্ব তার স্বীয় অধিক্ষেত্রে অন্য যে কোনো কাস্টমস কর্মকর্তার ওপর অর্পণ করতে পারবে মর্মে আইন সংশোধন করা হয়েছে।
আমদানিকৃত চালানের পণ্যমূল্য ২ হাজার টাকার পরিবর্তে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে তার বিপরীতে কোনো শুল্ককর আরোপ বা আদায় করা হবে না; কার্গো ঘোষণা বা আইজিএম দাখিলে ভুল হলে ন্যূনতম ৫০ হাজার কিন্তু অনধিক ২ লাখ টাকা জরিমানার পরিবর্তে শুধু অনধিক ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে; কোনো পণ্যের এইচএস কোড নির্ধারণে অগ্রিম রুলিং জারি হওয়ার তারিখ হতে ১৮ মাসের পরিবর্তে ৩৬ মাস পর্যন্ত কার্যকর রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; ইপিজেডস্থ শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল র্যাংকিং সিস্টেম (এসএস কোর্ড ৭৩০৮.৯০.২০ এবং মেটাল ডিটেক্টর মেশিন (এইচএস কোড ৮৫৪৩.৭০.৯০) আমদানির ক্ষেত্রে সর্বপ্রকার শুল্ককর হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।