সিনহা হত্যা মামলা

প্রদীপ-লিয়াকতের প্রাণদণ্ড, ছয়জনের যাবজ্জীবন বহাল

কক্সবাজারে আলোচিত মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় অধস্তন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ দাশ ও বরখাস্ত পুলিশ পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীর প্রাণদণ্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অন্য ছয়জনের সাজাও বহাল রেখেছে আদালত। গতকাল সোমবার প্রদীপ লিয়াকতের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) অনুমোদন ও আসামিদের আপিল খারিজ করে এ রায় দেয় বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি সগির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের বরখাস্ত উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাগর দেব, রুবেল শর্মা, পুলিশের সোর্স ও বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

ঘটনার তিন বছরের বেশি সময় পর অধস্তন আদালতের রায় এবং প্রায় পাঁচ বছর পর হাইকোর্টের রায় হলো। গত ২৩ এপ্রিল এ মামলায় হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। গত ২৯ মে শুনানি শেষে রায়ের জন্য ২ জুন (গতকাল) ধার্য করে হাইকোর্ট। ফৌজদারি মামলায় অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে এবং আসামি কারাগারে থাকলে তা অনুমোদনে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানি হয়। পাশাপাশি আসামিরা আপিলের সুযোগ পান। হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে আসামি সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগে আপিল কিংবা জেল আপিলের সুযোগ পান। আপিল বিভাগের রায়ে সর্বোচ্চ দণ্ড বহাল থাকলে আসামি রায় রিভিউয়ের (সাজা পুনর্বিবেচনা) আবেদন করতে পারেন। রিভিউ খারিজ হলে আসামি শেষ সুযোগ হিসেবে দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। সে আবেদন নাকচ হলে কারা কর্তৃপক্ষ কারাবিধি অনুযায়ী দণ্ড কার্যকর করে।

যেভাবে সিনহা হত্যাকাণ্ড ও বিচার : ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে ২০২০ সালে প্রায় এক মাস কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকার একটি রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন সিনহা ও তার দুজন সহযোগী দুই শিক্ষার্থী। ওই বছরের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে বাহাড়ছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তখনকার পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন সিনহা মো. রাশেদ খান। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রচারের পর দেশ জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। ঘটনার পর হত্যা মামলা করেন নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস। তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় র‌্যাব। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করা হয়। সিনহা হত্যার ঘটনার কিছুদিন পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে এ হত্যাকাণ্ডকে পুলিশের হঠকারী (অবিমৃশ্যকারী) ও অপেশাদারি আচরণ বলে উল্লেখ করে কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে গুলিবর্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মনে অসংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে।

সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল (বর্তমানে অবসরে) এক রায়ে প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পাশাপাশি ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ও পুলিশের অন্য সাতজনকে খালাস দেয় আদালত। বিচারক সিনহা হত্যার ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেন। পরে বিচারিক আদালতের রায়ের নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পাশাপাশি বিচারিক আদালতে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল করেন। এর ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টে এ রায় হলো।