স্বাস্থ্যে বরাদ্দ ব্যয়ের সক্ষমতা নিয়ে চিন্তা

গত সাত অর্থবছরের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এবারই সবচেয়ে কম বেড়েছে। সর্বশেষ চলতি অর্থবছরে তার আগের অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছিল ৩ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা বা ৮ শতাংশ। এবার বেড়েছে ৫০০ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। সে হিসেবে চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমেছে।

এ সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ২১ শতাংশ বরাদ্দ বেড়েছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে। এরপর ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ হাজার ৫১৫ কোটি বা ১২ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৪৮৪ কোটি বা ১১ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৫৬ বা ৮ দশমিক ১০ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ১৮৮ কোটি বা ৩ দশমিক ১২ শতাংশ ও সর্বনিম্ন আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়েছে। অবশ্য টানা গত ছয় বছর ধরেই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ৫ শতাংশের ওপরই রয়েছে। সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ বরাদ্দ ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ও সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে।

গত সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ আগামী অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন। তাতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য রয়েছে ৩১ হাজার ২২ কোটি এবং শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ১০ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা অবশ্য এবারের বাজেটে কিছু ‘ভালো দিক’ দেখতে পেয়েছেন। তাদের মতে, বাজেট গত বছরের তুলনায় কমেনি, বরং একটু বেড়েছে। এমনকি গত পাঁচ বছরের মতো এবারও বরাদ্দ ৫ শতাংশের ওপরই রয়েছে। পরিচালনা খাতে বরাদ্দ বাড়ায় চলমান স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলো চলমান থাকবে। অবশ্য প্রতিবারের মতো এবারও বরাদ্দ ব্যয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রতি বছরই সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কেটে নেওয়া হয়। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সময়মতো টাকা খরচ করতে পারে না। তাই এবার শুরু যেসব বাধার কারণে মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ বাজেট ব্যয় করতে পারে না, সরকারকে সেসব বাধা দূর করতে মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করার পরামর্শ দিয়েছেন।

বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় হয় না : এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট যা থাকে, সেটা একটা ফ্যাক্টর। গত বছরও ৪১ কোটি টাকার মতো বাজেট ছিল। কিন্তু দেখতে পেলাম ষাণ¥াসিকে এসে, অর্থাৎ বছরের মাঝপথে এসে ১৪ হাজার কোটি টাকা ফেরত নেওয়া হলো। থাকল ২৭ হাজার কোটি টাকা। তার মানে মোট বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ টাকা ফেরত যাচ্ছে। সংশোধিত বাজেটে যে ২৭ হাজার ৯০০ কোটি বা প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা থাকল, সেটা থেকেও জুনের শেষে দেখা যাবে ৭-৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা যায়নি। যা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তার অর্ধেকও ব্যয় করতে না পারায় সরকার সেই টাকা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

এই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, সরকার সংশোধিত বাজেটের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ফেরত নিচ্ছে। কারণ অর্থ মন্ত্রণালয় যখন ছয় মাসের সময় বাজেট রিভিউ করে, তখন দেখে যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সেটার ২০ শতাংশও খরচ করতে পারেনি। পরের ছয় মাসে তো আর বাকি ৮০ শতাংশ খরচ করা সম্ভব নয়। তখন স্বাস্থ্য খাত থেকে ব্যয় করতে না পারার কারণে আনুপাতিক হারে একটি অর্থ নিয়ে যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খরচের যে অগ্রগতি, সেটি বছরের সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাক্সিক্ষত লেভেলে না থাকার কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য থেকে রিভাইজ বাজেটের সময়ে টাকা নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, সরকার লম্বা একটি বাজেট দিল। এ বরাদ্দ ৬০ হাজার কোটি টাকা হলে আমরা খুশি হতাম। সেই খুশিতে কোনো লাভ হতো না। ছয় মাস পর দেখা যেত ৩০ হাজার কোটি টাকা সরকার ফেরত নিয়ে যাচ্ছে। কারণ মন্ত্রণালয়ের খরচ করার সক্ষমতা নেই।

মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের সক্ষমতা দরকার : অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, এ বছর যে ৪২ হাজার কোটি টাকার মতো বরাদ্দ হলো, আমরা চাই রিভাইজ বা সংশোধিত বাজেটের সময় যেন এখান থেকে একটি টাকাও কর্তন না করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খরচের সক্ষমতা বাড়–ক। অর্থাৎ বরাদ্দ টাকার সবটুকু খরচ হোক। যদি মন্ত্রণালয় খরচ করতে না পারে, তাহলে প্রস্তাবিত বরাদ্দ বেশি হলে লাভ নেই। এই বাজেট ছয় মাস পর যখন রিভিউ হবে, তখন যেন সরকার কোনো টাকা ফেরত নিতে না পারে, সেজন্য মন্ত্রণালয়কে অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার এখনই উদঘাটন করুক কেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাক্সিক্ষত লেভেলে খরচ করতে পারে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যত দপ্তর আছে ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরকার বসুক। বাজেট ব্যয় করতে না পারার কারণগুলো চিহ্নিত করুক। এ বিষয়ে স্টাডিও আছে। সরকার এ কারণগুলো জানে। সুতরাং সরকার ১ জুলাই থেকেই এ কারণগুলো সমাধানের চেষ্টা করবে। বাধাগুলো দূর করার চেষ্টা করবে। যাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পুরো টাকা খরচ করতে পারে। টাকা খরচ করতে পারলে বেশি টাকা পাওয়ার সুযোগ আগামীতে তৈরি হবে। আর যদি টাকা খরচ করতে না পারে, তাহলে টাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে লাভ নেই। আমার দুটি পরামর্শ হলো, সরকার যেন প্রস্তাবিত বরাদ্দ থেকে টাকা ফেরত না নেয় এবং এই টাকা যেন ঠিকমতো ব্যয় হয়, সেজন্য সরকারের প্রচেষ্টা শুরু থেকেই দরকার।

বাজেটে ভালো দিক আছে : অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, বাজেট ভালো-মন্দ বলার সুযোগ নেই। সরকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দিয়ে এ বাজেট কতটা সফলভাবে খরচ করাতে পারল সেটাই বাজেটের মূল বিষয়। বাজেট গত বছরের তুলনায় কমেনি, বরং একটু বেড়েছে। উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ কমেছে, পরিচালনায় বেড়েছে। এতে গত বছর যেসব কর্মসূচি ছিল, এ বছরও সেগুলো করতে পারবে। সরকার নতুন কোনো প্রকল্প নেয়নি। আগের বছর যেসব প্রকল্প ছিল, সরকার সেগুলোর জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। বাজেট যেহেতু গত বছরের তুলনায় আনুপাতিক হারে কমেনি, গত বছর ৫ দশমিক ২ শতাংশ ছিল, এবার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। তার মানে এটা একটা ভালো দিক বাজেট ৫ শতাংশের ওপরে আছে, নিচে নামেনি।

দরকার বছর জুড়ে ব্যয় : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজেটের পরিমাণটা গুরুত্বপূর্ণ, শতাংশটা আপেক্ষিক। ৫০০ কোটি টাকা বাড়ালাম। কিন্তু সুশাসন হলো না। তাহলে সেই বরাদ্দ কাজে আসবে না। স্বাস্থ্য খাতে ৫০০ কোটি টাকা বেড়েছে। এটা ভালো। কিন্তু এই বৃদ্ধিও কম। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী জিডিপির অনুপাতে যে হারে বরাদ্দ প্রয়োজন, সেটা থেকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। এ ছাড়া বরাদ্দ ব্যয়ের জন্য শেষ তিন মাসে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। অথচ বছর জুড়ে সমানুপাতিক হারে ব্যয় হয় না। অথচ ব্যয় বছর জুড়ে করতে হবে। তবে বাজেট বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ সুশাসন। সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ অর্থ বাস্তবায়নটা খুব জরুরি। প্রতি বছর অদক্ষতা ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির কারণে বাজেট ব্যয় করা যাচ্ছে না।

একনজরে স্বাস্থ্যের বাজেট : বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ ছিল ৩০ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এবার এ খাতে বরাদ্দ ৮৯৭ কোটি টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে এই খাতে বরাদ্দ ৩৯৭ কোটি টাকা কমেছে। এ বছর স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা কমেছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ১৯০ কোটি ও এ বছর প্রস্তাব করা হয়েছে ১৭ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং জনস্বার্থে রেফারেল হাসপাতালের পাশাপাশি ৫০ শয্যার অধিক হাসপাতাল স্থাপনের জন্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। পাশাপাশি হাসপাতাল বেড উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় উপকরণ ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি ও স্থানীয়ভাবে কেনার ক্ষেত্রে সমুদয় ভ্যাট আগামী ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহতি প্রদান করে কাস্টমস আইন-২০২৩ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নতুন বাজেটে ক্যানসার প্রতিরোধক ওষুধসহ সব ধরনের ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও এপিআই তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া সাধারণ ও আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সসহ হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক ভেহিক্যালকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কেয়ারগিভার ও নার্সদের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে। নার্সিং শিক্ষায় পিএইচডি কোর্স চালু এবং আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য একটি নার্স শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের শূন্য পদ পূরণে চিকিৎসক, সেবিকা, টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট ও স্বাস্থ্য সহকারীদের নিয়োগ ত্বরান্বিত এবং প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।