১০ বছরের বেশি সময় আগে ঢাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের খোঁজ মিলেছিল ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে। এ ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য। শেখ হাসিনা ছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান ও সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলামকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির তখনকার যুগ্ম মহাসচিব ও দলটির মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদ। দুই মাস পর ১১ মে শিলংয়ের পুলিশ সালাহউদ্দিন আহমেদকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। ভারতে প্রবেশের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তার বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। সেই মামলায় খালাস পেলেও পাসপোর্ট না থাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন তাকে ভারতে থাকতে হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ট্রাভেল পারমিট নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।
গতকাল তিনি ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নিজের মামলাটি রেকর্ড করালাম। প্রাথমিকভাবে শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ র্যাব ও পুলিশের যারা জড়িত ছিল এমন ৭ জনকে আসামি করেছি। অজ্ঞাতপরিচয়ের আরও অনেক আসামির নাম তদন্তে বের হবে।’
তিনি বলেন, ‘শুধু আমার মামলার কথা বলব না, বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমে যারা আমার মতো গুমের শিকার হয়েছিলেন, জুডিশিয়াল কিলিং, পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেছেন, যারা বিভিন্নভাবে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তারা ভুক্তভোগীরা যাতে মামলা করেন সেজন্য আহবান জানাচ্ছি।’ সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি কী দেখতে চাই, সেটা ন্যায়বিচার নয়। আইন যেভাবে মনে করবে, বিচারে যেভাবে সাব্যস্ত হবে সেটাই আমরা মেনে নেব। আমি তো চাইব সর্বোচ্চ সাজা হোক। আইন আদালত সে সিদ্ধান্ত নেবে।’
বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক বদরুদ্দোজা বাদল, রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রমুখ সে সময় উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়, বিচার
স্বাধীনভাবে চলবে : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘এখন জাতীয়ভাবে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়, বিচার স্বাধীনভাবে চলবে। এই সরকারের পরে যারা সরকারে আসবে, তাদের সেটা টেনে নিয়ে যেতে হবে।’
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) আয়োজনে ‘গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনের রোডম্যাপ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সালাহউদ্দিন এ কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আরও বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। সেগুলোর বিচার করতে গেলে অনেক সময় লাগবে এবং সেই সময়ে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে বিচারের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। সুতরাং বিচারের সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক সরাসরি আছে, সেটা বলা ঠিক হবে না। আর বিচারের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়া অবিচারের শামিল। কারণ, বিচারের দীর্ঘ প্রক্রিয়া আমরা সবাই জানি এবং সুবিচার করতে হলে সময় দিতে হয়।’
দেশে এবং বিদেশে বসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা সৃষ্টির অনেক চেষ্টা হয়েছে অভিযোগ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এ দেশে কেউ অপরাধ করে পার পাবেন না। বর্তমান অস্থির পরিস্থিতি বন্ধের উপায় হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠিত করা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেটি যত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে ততই জাতির জন্য মঙ্গল।’ যৌক্তিকভাবে সবকিছু বিবেচনা করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের সভাপতিত্বে ও দলটির সহসভাপতি ফারুক হাসানের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ প্রমুখ।
এদিকে গতকাল দুপুরে পল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে জিয়াউর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী তাঁতীদলের উদ্যোগে দুস্থদের ঈদসামগ্রী বিতরণকালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আপনারা (সরকার) ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন। এই বাজেটের শেখ হাসিনার সঙ্গে পার্থক্য কী বলুন? শেখ হাসিনাও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছিলেন, আপনারাও দিয়েছেন। আমরা চাই বাংলাদেশ ভালো চলুক। দেশে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। নির্বাচনটা কবে হবে আর কত দেরি হবে জিজ্ঞেস করলে উপদেষ্টা চুপ করে থাকেন। একটা সময় সংস্কারকে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী করেছে। সংস্কার সামনে নিয়ে এসেছে। এখন তাও বলছে না।’
অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া বাজেট সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘এটা তো অন্তর্বর্তী সরকার। ড. ইউনূসের সরকার। এই সরকারের হাত দিয়ে কেন খারাপ কাজ হবে, এটা মানুষ জানতে চায়। বাজেটের ২৩ শতাংশ ওপরে যাবে শুধু প্রশাসনের বেতনের জন্য। আর সুদের টাকা যাবে ১৪ শতাংশ। তাহলে গরিব মানুষের জন্য কী রেখেছেন? লাভের গুড় তো পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলছে, তাহলে জনগণের জন্য কী করলেন?’
রিজভী বলেন, ‘স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম। কিন্তু আমাদের তো বেশি দরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা তো সরকারই দেখবে। ড. ইউনূস ক্ষমতায় আসার আগে অনেক কথা বলেছেন। এখন তো তিনি নিজে ক্ষমতায়। তিনি তো গরিব মানুষকে দেখবেন। তিনি বলেছিলেন দারিদ্রকে জাদুঘরে পাঠান। এখন দেখছি উনার হাত দিয়ে লুটেরা, ব্যাংক ডাকাতরা যাদের হাতে কালো টাকা তারা সাদা করার সুযোগ পাচ্ছে।’
তাঁতীদলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের সঞ্চালনায় এ সময় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্মমহাসচিব আব্দুস সালাম, স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।