আতঙ্কে নগরবাসী, আস্থা রাখতে বলছে পুলিশ

এবারের ঈদুল আজহায় লম্বা ছুটি। আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়ে ছুটি শেষ হবে আগামী ১৪ জুন। এ সময় রাজধানী ঢাকা অনেকটাই ফাঁকা থাকবে। অন্যবারের চেয়ে এবার অনেক বেশি মানুষ ঢাকা ছাড়বেন বলে ধারণা। ছুটির সময় ঢাকায় চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বেড়ে যায়। নগরবাসীকে একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়ে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ঈদুল ফিতরে ঢাকা মহানগরীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে তুলনামূলকভাবে অপরাধ কম ছিল। পাশাপাশি বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরাও (অক্সিলিয়ারি ফোর্স) কাজ করেছে। এবারও নিরাপত্তাবিধানে অক্সিলিয়ারি ফোর্স থাকবে। ঈদুল আজহায় পশুসম্পদের নিরাপত্তার বিষয় থাকে; কোরবানির পর আবাসিক এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট করে পুলিশ মোতায়নের কথা বলা না হলেও রেগুলার চেকপোস্ট ও টহল টিমের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্তি কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নিরাপদে ঈদ উৎসব পালন করুন, পুলিশের ওপর আস্থা রাখুন।’

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি প্রভৃতি অপরাধ ঠেকাতে রাতের বেলায় পুলিশি টহল বাড়ানো হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে বাস, লঞ্চ ও রেলস্টেশনে। পুরান ঢাকা ছাড়াও মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার জুয়েলারি মার্কেটে পুলিশের কড়া নজরদারি থাকবে। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ফোর্স থাকবে, সাদা পোশাকেও নজরদারি থাকবে। কোরবানির পশুর হাটগুলোতে রয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। বিভিন্ন মার্কেট, বিপণিবিতান, কাঁচাবাজার, আড়তের নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থান, সড়ক, স্থাপনা, মার্কেট, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চ টার্মিনালে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ডাকাত, ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের ধরতে পুলিশ ও র‌্যাবের বিশেষ টিম সক্রিয় রয়েছে।

নগরীর নিরাপত্তায় ব্যবসায়ী ও বাড়ি মালিকদের ভাবনা : ঈদের ছুটিতে দোকানপাট, মার্কেট বিশেষ করে স্বর্ণের দোকান ঝুঁকিতে থাকে। ধানম-ি, নিউমার্কেট ও পল্টনের কয়েক দোকানি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাদের বড় মার্কেটে দোকান রয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে তেমন উদ্বেগ নেই। কারণ সেখানে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। পুরো মার্কেট সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকে, নিরাপত্তা প্রহরীরাও প্রশিক্ষিত। আর যাদের দোকান ছোট মার্কেটে বা আলাদা তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি। ওই সব দোকানেই ঈদের সময় চুরি-ডাকাতি হয়। অনেক সময় সিকিউরিটি গার্ডরাও এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই আমাদের দাবি ছুটির সময় যেন মার্কেট এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়; বিশেষ করে রাতে। আর যে এলাকা একটু বেশি ফাঁকা সেখানে টহল বেশি রাখা দরকার।’

ফাঁকা ঢাকায় চোর-ডাকাতরা নতুন কৌশল অবলম্বন কওে এমন কথা উল্লেখ করে কয়েকজন বাড়িওয়ালা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘চোরচক্র নারী সদস্যদের ব্যবহার করছে। তারা শিশুদের সঙ্গে নিয়ে এমনভাবে যায় যে, তারা কোনো বাসায় বেড়াতে এসেছে। এভাবে তারা ফ্ল্যাটে ঢুকে চুরি করে। আবার কোনো ফ্ল্যাটে দুজন দারোয়ান থাকলে একজন ছুটিতে থাকে, এ সুযোগে চোর দিনের বেলাতেই ঢুকে পড়ে। আর আলাদা বা ছোট বাড়িতে গ্রিলকাটা চোর বা ডাকাতরা সুযোগ নেয়। ফাঁকা ঢাকায় ছিনতাইকারী ও প্রতারকচক্র বেড়ে যায়। তারা রাস্তার পাশে অসুস্থতার ভান করে শুয়ে থাকে। সহায়তা করতে গেলেই বিপদে পড়ার আশঙ্কা। চেতনানাশক দিয়ে প্রতারকরা সব কেড়ে নেয়।’

যেসব এলাকা অপরাধপ্রবণ : নগরীর সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকায় রয়েছে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তেজগাঁও, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ী। এসব এলাকায় হরহামেশাই ঘটছে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। ফাঁকা ঢাকার উত্তরা, পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার ও পল্টনে প্রায়ই নানা অপরাধ ঘটে। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এবার ঈদুল আজহায় দুই ভাগে বিভক্ত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কোরবানির পশুর হাটকেন্দ্রিক নিরাপত্তা এবং কোরবানির পরে আবাসিক এলাকা ও দোকান-মার্কেটকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এলাকাভিত্তিক অপরাধ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাকায় প্রতিদিন (২৪ ঘণ্টা) ৬৫০টি টহল টিম ও ৭০টি চেক পোস্ট থাকে; ঈদ বা উৎসবকে কেন্দ্র করে তা বাড়ানো হয়। আশা করা যাচ্ছে, এবারের ছুটিতে তেমন অপরাধ ঘটবে না।’

পুলিশের পরামর্শ ও নিরাপত্তা : ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বিশেষ নিরাপত্তার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নগরবাসীকে আমরা একগুচ্ছ পরামর্শও দিয়েছি। আমরা বাড়তি টহল, চেকপোস্ট, নজরদারির ব্যবস্থা করছি। নগরবাসীকেও তাদের বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। ফাঁকা ঢাকায় মোটরসাইকেলসহ যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হবে।’

গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘ঈদের ১০ দিনের ছুটিতে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। ঈদুল আজহায় পুলিশের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ঈদযাত্রায় চাঁদাবাজি বন্ধেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। ঈদের সময় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঈদুল আজহা উপলক্ষে ডিএমপির নির্দেশনা : বাসা-বাড়ি, অফিস, বিপণিবিতানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে তালাবদ্ধ করা; বাসা কিংবা অফিসে সিসি ক্যামেরা লাগানোর পাশাপাশি অর্থসহ মূল্যবান সামগ্রী ও দলিলদস্তাবেজ নিরাপদ স্থানে বা নিকট আত্মীয়ের হেফাজতে রাখা অথবা প্রয়োজনে ব্যাংক লকারের সহায়তা নেওয়া; রাতে কিংবা দিনে একসঙ্গে মুখে মাস্ক এবং মাথায় ক্যাপ পরিহিত অপরিচিত সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধির ওপর নজর রাখা, প্রয়োজনে ৯৯৯-এ কল করে জানানো। মোটরসাইকেল চুরি রোধে অ্যালার্ম লাগাতে বলা হয়েছে।

ঈদ নিরাপত্তায় র‌্যাব : র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর হাট, আর্থিক লেনদেন, জনসমাগম ও অনলাইনে লেনদেনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে র‌্যাব। দেশের শপিংমলগুলোয় থাকবে র‌্যাবের বিশেষ নজরদারি। অনুষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাওয়া নারীদের হয়রানি ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’