পবিত্র ঈদুল আজহা শুধু কোরবানির নয়, হাজারো মানুষের রোজগারেরও উপলক্ষ্য। কোরবানির পশু জবাইয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরির ধুম পড়ে কামারপট্টিগুলোতে। এক সময়ের প্রায় বিলুপ্ত পেশা ঈদ ঘিরে যেন পায় নতুন প্রাণ।
ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই ঘুম হারাম হয়ে যায় কামারদের। রোজকার নিরিবিলি পাড়াগুলোতে তখন ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ভেসে আসে হাতুড়ির শব্দ, ধোঁয়া আর আগুনের গন্ধ। কামারপট্টিতে শুরু হয় দা-বটি, ছুরি আর চাপাতি তৈরির প্রতিযোগিতা।
বিভিন্ন বাজারের কামার পাড়া ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে টুং টাং শব্দ। কেউ ভারী হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছেন দগদগে লাল লোহার খন্ড, আবার কেউ শান দিচ্ছেন ছুরি কিংবা বঁটি, কেউবা আবার কয়লার আগুনে বাতাস দিচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে তাদের কর্মব্যস্ততা। ঈদের আগ দিন পর্যন্ত চলবে এমন কর্মব্যস্ততা। কোরবানির সময় তাদের আয় বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকেন তারা। তবে কয়লা ও লোহার দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ না থাকলেও পূর্ব পুরুষের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান অনেক কামাররা।
চট্টগ্রামের চকবাজারের তেলিপট্টি যেন এই সময়টায় এক আলাদা শহর। আগুনে তপ্ত লোহায় বারবার হাতুড়ি চালিয়ে কামাররা তৈরি করছেন কোরবানির অন্যতম প্রধান সরঞ্জাম- দা, বটি, ছুরি ও ধামা। একইসঙ্গে পুরোনো যন্ত্রপাতিতে শান দেওয়ার কাজও চলছে সমানতালে।
তেলিপট্টিতে ঘুরে দেখা গেছে, দামের ব্যবধান যন্ত্রপাতির মান ও উপকরণের ওপর নির্ভর করে। স্প্রিং দিয়ে তৈরি ভালো দা বিক্রি হচ্ছে ৭০০–৮০০ টাকায়, বটি ৫০০–১০০০ টাকা, ধামা ৮০০–১৫০০ টাকায়। পুরোনো যন্ত্রপাতি শান দেওয়ার খরচ ৫০–২০০ টাকার মধ্যে।
দেশি দার ভরসা
বিদেশি ছুরি দেখতে ভালো, কিন্তু কাজের সময় দেখা যায় ঠিকমতো কাটা যায় না। কামারদের বানানো দেশি দা-ছুরি অনেক কার্যকর। তাই এবার পুরোনো দা-বটিতে শান দিচ্ছি, সঙ্গে নতুন চাপাতিও কিনছি।
ঈদ উপলক্ষে শুধু কামারপট্টি নয়, জমে উঠেছে নগরের বিভিন্ন মোড়ে মৌসুমি বাজার। তেঁতুল কাঠের খাটিয়া, শুকনো খড়, চাটাই সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। তেঁতুল গাছের খাটিয়া বেশি জনপ্রিয়, কারণ এতে দা-বটির আঘাত ভালোভাবে সহ্য হয়।
এই খাটিয়াগুলোর দাম ৩০০–৫০০ টাকা, প্রতিটি খড়ের আঁটি ১০০ টাকা এবং চাটাই বিক্রি হচ্ছে ২৫০–৬০০ টাকায় সাইজ অনুযায়ী।
কোরবানির ঈদ এলেই মনে পড়ে গ্রামীণ জীবনের চিরাচরিত দৃশ্য-লোহার দা-বটি বানানোর ধোঁয়াময় কর্মযজ্ঞ। এক সময় এই পেশা হারাতে বসেছিল যান্ত্রিক যুগে, তবে প্রতি বছর কোরবানিকে ঘিরে কামারপট্টিগুলোর এই জেগে ওঠা যেন প্রমাণ করে, পরিশ্রম আর ঐতিহ্য কখনও ফুরায় না।