তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করায় দেশে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেরিতে হলেও অন্তর্র্বর্তী সরকারের এমন সিদ্ধান্ত দেশে গ্যাস সংকট কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এলএনজি আমদানির দিকে অতি মাত্রায় ঝুঁকলে সেটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। এক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন অন্তত ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবারহ করা হচ্ছে ২ হাজার ২০০ মিলিয়নেরও কম। যার মধ্যে আমদানি করা হচ্ছে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন। তবে দেশে আমদানির সক্ষমতা রয়েছে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগ হয়েছে মতবিশেষজ্ঞদের
দাম বেশি হওয়া এবং অর্থের অভাবে পুরো সক্ষমতার এলএনজি আমদানি করা যাচ্ছে না।
বিদেশ থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানির পর কম দামে বিক্রি করার কারণে এমনিতেই লোকসান গুনছিল বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। এর সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একই গ্যাসে দুই বার শুল্ককর নেওয়ায় সংস্থাটির লোকসান আরও বাড়িয়ে দেয়।
দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরের বকেয়া শোধ করতে পারছিল না পেট্রোবাংলা। তাই একই গ্যাসে দুই বার ভ্যাট না নিয়ে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের আবেদন করে তারা। জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনার পর এবারের বাজেটে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, বর্তমানে গড়ে ১৪ ডলারে এলএনজি কিনছে পেট্রোবাংলা। ১২২ থেকে ১২৩ টাকায় ডলার মিলছে। এ হিসাবে বছরে ১০০ থেকে ১০৫টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হলে বছরে ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। যদিও এটি নির্ভর করছে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওপর।
একই সঙ্গে উৎসে কর কমেছে ৬৬ শতাংশ। এতে তিতাস ও বাখরাবাদের মতো বিতরণ কোম্পানির খরচ অনেক কমে যাবে। পরিকল্পনা অনুসারে কারিগরি ক্ষতি কমাতে পারলে শিগগিরই মুনাফায় ফিরতে পারে তারা।
বর্তমানে প্রতি ইউনিট গ্যাস সরবরাহে পেট্রোবাংলার খরচ হচ্ছে ২৯ টাকা ৩৯ পয়সা। আর তারা এটি বিক্রি করে পাচ্ছে ২২ টাকা ৮৭ পয়সা। লোকসান মেটাতে প্রতিবছর সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেয় তারা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৩২ কোটি ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৫ কোটি টাকা ভর্তুকি নিয়েছে তারা। তবে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তাই খরচ কমাতে নানা উপায় খুঁজছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, এলএনজি আমদানি খরচ কমে গেলে আরও বেশি হারে কার্গো আমদানি করা যাবে। ইতিমধ্যে আমদানি বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে। শিল্পের গ্যাস-সংকট কেটে যাবে। উৎসে কর কমানোয় বিতরণ কোম্পানির খরচও কমে আসবে। তবে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তখন আবার পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে যেতে পারে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রমতে, গত বছর ৮৪ কার্গো এলএনজি আনা হয়েছে। এবার শুরুতে ৯২ কার্গো আনার পরিকল্পনা থাকলেও এখন তা বাড়িয়ে ৯৮ কার্গো করা হয়েছে।
২০২০ সালে স্পট মার্কেটে ৬ থেকে ৭ ডলারে পাওয়া যেত প্রতি ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সেই এলএনজির দাম ৬২ ডলারে গিয়ে ঠেকে। দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২৩ সালের আগস্টে খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ করে বাংলাদেশ। বর্তমানে কমবেশি ১৩ ডলার খরচ পড়ছে এলএনজি আমদানিতে।
শেভরন বাংলাদেশকে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম দেওয়া হয় ২ দশমকি ৭৬ ডলার, আর টাল্লোর সঙ্গে চুক্তি রয়েছে ২ দশমকি ৩১ ডলার। বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ৩টি কোম্পানির কাজ থেকে গ্যাস কিনে থাকে পেট্রোবাংলা। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানিকে প্রতি হাজার ঘনফুটের দাম দেওয়া হয় ২৮ টাকার মতো, বাপেক্সকে দেওয়া হয় ১১২ টাকার মতো। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম পড়েছে ১০.৬৬ ডলার ও ওমান থেকে আনা এলএনজির দাম পড়েছে ১০.০৯ ডলার।
দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের গড় মূল্য দেখা যাচ্ছে ৬.০৭ টাকা, আর ২৫ শতাংশ চড়াদামে আমদানির পর দর দাঁড়াচ্ছে ২৯.৭২ টাকা (মে ২০২৫)। গড় বিক্রয় দর রয়েছে ২২.৬৪ টাকা, এতে করে ঘনমিটার প্রতি ৭ টাকা ৮ পয়সা হারে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে বিগত ৩ দশকের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার বাজেটে জ্বালানি ও খনিজসম্পদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিগুণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জ্বালানি খাতে, ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে বাপেক্স কর্তৃক জরিপ, মধ্যমেয়াদে বাপেক্সের রিগ দিয়ে ৬৯টি কূপ খনন ও ৩১টি কূপের ওয়াকওভারের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। যথাযথভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন (দৈনিক) ১৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনা উচ্চাভিলাষী মনে করলেও অসম্ভব মনে করছেন না কেউই।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ খাতে ২ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে (২০২৪-২৫) ১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব ছিল। যা সংশোধিত বাজেটে হয়েছে ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৯৯৪ কোটি টাকা যা সংশোধিত বাজেটে আকার হয়েছিল ১ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা।