ইরানে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা গত বছরের তুলনায় পরিসর ও তীব্রতায় অনেক বেশি ব্যাপক এবং নির্মম। গত বছর ইরানে ইসরায়েলের চালানো দুটি হামলা মূলত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ করলেও, এবারের হামলা শুধু সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্মূল করার কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয়েছে। এই কৌশলটি গত বছর নভেম্বরে লেবাননে হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানের সঙ্গে বেশ মিলে যায়, যেখানে হিজবুল্লাহর ঊর্ধ্বতন নেতাদের নির্মূল করে গোষ্ঠীটির সাংগঠনিক কাঠামোকে প্রায় ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ইরানে এবারের হামলায়ও একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে ইসরায়েল দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর গভীর আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
শুক্রবার ভোররাতে ইরানে ইসরায়েলের হামলার ভিডিও ফুটেজে তেহরান, ইস্ফাহান এবং শিরাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে বেশ কয়েকটি ভবনে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। এই ভবনগুলো ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের সদর দপ্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দৃশ্যের সঙ্গে গত বছর লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিতে ইসরায়েলের হামলার দৃশ্যের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে, যেখানে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হয়েছিলেন। তবে ইরানে এবারের হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না। তারপরও ইরানের মিলিটারি চিফ অব স্টাফ হোসেইন সালামি, রেভল্যুশনারি গার্ডসের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কমান্ডার, দুজন শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং অন্যান্য সামরিক নেতার মৃত্যু ইরানের শাসনব্যবস্থার অভিজাত মহলে নজিরবিহীন ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ড ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোতে গভীর ধাক্কা সৃষ্টি করেছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে।
ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই হামলার লক্ষ্য শুধু ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা নয়, বরং দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার আলফ্রেড ডিকিন ইনস্টিটিউটের মিডল ইস্ট স্টাডিজ ফোরামের পরিচালক শাহরাম আকবরজাদেহ আলজাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েল এই সংঘর্ষকে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিয়েছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। ইসরায়েলের কৌশলের একটি বড় অংশ হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করা। যদি এ সংঘর্ষ বড় আকার ধারণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হবে ইসরায়েলের পক্ষে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে।’
আকবরজাদেহ আরও যোগ করেন, ‘ইসরায়েলের এই হামলার পেছনে আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে ইরানের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান অসন্তোষকে উসকে দেওয়া। ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বেশ কয়েকবার দেখা গেছে। ইসরায়েল সম্ভবত এ হামলার মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকে আরও তীব্র করতে চাইছে, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পায় এবং শাসনব্যবস্থায় ফাটল ধরে।’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আলোচনার প্রেক্ষাপট
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনাকে ইসরায়েলের জন্য ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন। এই হামলার সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ। রবিবার ওমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ষষ্ঠ দফা পারমাণবিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তেহরানের কাছে এমন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা দিয়ে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ১৫টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। এই দাবি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। ইসরায়েল সম্ভবত এই হামলার মাধ্যমে আলোচনাকে পুরোপুরি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া, হামলার সময়টি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বর্তমানে নেতানিয়াহু ইসরায়েলে রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে রয়েছেন। গাজায় দীর্ঘদিনের অভিযান এবং সেখানে আটক জিম্মিদের উদ্ধারে ব্যর্থতার কারণে তার জনপ্রিয়তা কমছে। কয়েক দিন আগে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে আগাম নির্বাচনের জন্য একটি বিলের ওপর ভোটাভুটি হয়, যেখানে নেতানিয়াহু অল্প ব্যবধানে রক্ষা পেয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে, ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় সামরিক পদক্ষেপ নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং জনগণের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে তার সমর্থন বাড়াতে পারে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইরানের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের এই হামলার জবাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো প্রায় নিশ্চিত। গত বছর ইসরায়েলে ইরানের দুটি হামলার তুলনায় এবারের পাল্টা হামলা আরও ভয়াবহ হতে পারে। তবে, ইরানের জন্য এমন একটি শক্তিশালী জবাব দেওয়া কঠিন হতে পারে। হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য মিত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আকবরজাদেহ ব্যাখ্যা করেন, ‘ইরান এই হামলার জবাবে “ইটের বদলে পাটকেল” ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, ইসরায়েলের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করছে। তবে এটা স্পষ্ট, ইরান তাদের সামরিক কমান্ডার, বিজ্ঞানী, সামরিক স্থাপনা ও পারমাণবিক কেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলা বরদাশত করবে না। তাই ইরানও প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং তা পুরো অঞ্চলের জন্য একটি বিপজ্জনক মোড় হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ও সরকারবিরোধী হতাশা জমে আছে। ইসরায়েল এই উত্তেজনাকে উসকে দিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যাতে ইরানের সাধারণ জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ তৈরি হয়।’
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো, যেমন হিজবুল্লাহ, হামাস এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিতে পারে। তবে, তাদের দুর্বল সামরিক সক্ষমতা ইরানের জন্য বড় ধরনের পাল্টা হামলা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলতে পারে। এ ছাড়া, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করতে পারে, যা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও তীব্র করতে পারে।