সুরা দোহা নাজিলের প্রেক্ষাপট

পবিত্র কোরআনের ৯৩ নম্বর সুরা দোহা ছিল মহানবী (সা.)-এর জন্য সান্ত্বনাদায়ক বাণী, যা প্রতিটি দুঃখিত ও অবহেলিত মুমিনের জন্যও প্রশান্তিদায়ক। একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ হন। এ কারণে তিনি এক বা দুই রাত নামাজ আদায়ের জন্য বের হতে পারেননি। তখন এক মহিলা এসে বলল, ‘মুহাম্মদ আমি তো দেখছি তোমার শয়তান তোমাকে ত্যাগ করেছে (নাউজুবিল্লাহ), এক রাত বা দু রাত তো তোমার কাছেও আসেনি।’ (সহিহ বুখারি) অপর বর্ণনায় এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ওহি আসতে বিলম্ব হয়, এতে মুশরিকরা বলতে শুরু করে যে, মুহাম্মদকে তার আল্লাহ পরিত্যাগ করেছেন এবং তার প্রতি রুষ্ট হয়েছেন (নাউজুবিল্লাহ)। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সুরা দোহা নাজিল হয়। (সহিহ মুসলিম)

নবীজিকে সান্ত্বনা দিতে মহান আল্লাহ এ সুরার শুরুতে বলেন, ‘সকালের উজ্জ্বল আলোর শপথ, শপথ রাতের, যখন সেটার অন্ধকার গভীর হয়।’ এখানে আল্লাহ নিজের সৃষ্টি দিয়ে শপথ করছেন দিন ও রাত, আলো ও অন্ধকার সবকিছুই আমি নিয়ন্ত্রণ করি। এরপর সরাসরি নবীজিকে উদ্দেশ্য করে ঘোষণা দেন, ‘আপনার প্রতিপালক আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি নারাজও হননি।’ এটি ছিল এক মহা সান্ত্বনার ঘোষণা। এরপর নবীজিকে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, আপনার প্রতি আল্লাহর নেয়ামত দিন দিন বেড়েই যাবে এবং প্রত্যেক প্রথম অবস্থা থেকে পরবর্তী অবস্থা উত্তম হবে। এতে জ্ঞানগরিমা ও আল্লাহর নৈকট্যে উন্নতি লাভসহ জীবিকা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রভৃতি সবই অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর রাসুলের জন্য আখেরাত তো দুনিয়া থেকে অনেক, অনেক বেশি উত্তম হবে।

এরপর বলা হয়েছে, আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এত প্রাচুর্য দেবেন যে, তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। এতে কী দেবেন, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, প্রত্যেক কাম্যবস্তুই প্রচুর পরিমাণে দেবেন।

আল্লাহ তার রাসুলকে ভুলে যাননি এবং তাকে বিশেষ দানে সন্তুষ্ট করবেন, এই সুসংবাদ দেওয়ার পর তিনি রাসুল (সা.)-এর প্রতি কিছু নেয়ামতের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেছেন পরবর্তী আয়াতে।

প্রথম নেয়ামত হচ্ছে, আমি আপনাকে পিতৃহীন পেয়েছি। আপনার জন্মের পূর্বেই পিতা ইন্তেকাল করেছিলেন এবং ছোট থাকতেই মা মারা যান। অতঃপর আমি আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি। অর্থাৎ প্রথমে পিতামহ আবদুল মুত্তালিব, পরে পিতৃব্য আবু তালেব যতœ সহকারে আপনাকে লালন-পালন করেছেন।  রাসুল (সা.)-কে দেওয়া আল্লাহর নেয়ামতের আলোচনায় আরও বলা হয়েছে, তিনি তাকে অনভিজ্ঞ, অনবহিত পেয়েছিলেন। নবুয়ত লাভের পূর্বে তিনি আল্লাহর বিধিবিধান সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন। অতঃপর নবুয়তের পদ দান করে তাকে পথনির্দেশ দেওয়া হয়, যা তিনি জানতেন না তা জানানো হয়; সর্বোত্তম আমলের তওফিক দেওয়া হয়।

এরপর তৃতীয় নেয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, মহান আল্লাহ তাকে নিঃস্ব ও রিক্তহস্ত পেয়েছেন, অতঃপর তাকে অভাবমুক্ত করেছেন এবং ধৈর্যশীল ও সন্তুষ্ট করেছেন।

এ নেয়ামতগুলো উল্লেখ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কয়েকটি বিষয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম নির্দেশ হচ্ছে, এতিমের সঙ্গে কঠোর ব্যবহার করবেন না। দ্বিতীয় নির্দেশ হচ্ছে, কোনো অভাবী ও দ্বীন সম্পর্কে জানে না এমন জানতে চাওয়া ব্যক্তিকে ধমক বা ভর্ৎসনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তৃতীয় নির্দেশ হচ্ছে, মানুষের সামনে আল্লাহর নেয়ামতসমূহ বর্ণনা করার বিষয়ে।