ইরানের ট্রাম্পকার্ড হরমুজ প্রণালি!

ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার পারদ বাড়ছেই। তাতে একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিসরে যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরআইএনএনকে এমনটাই জানিয়েছে দেশটির কট্টরপন্থি সংসদ সদস্য ইসমাইল কোসারি। তার এই মন্তব্যে বিশ্ব জুড়ে তেলের বাজার পড়েছে অনিশ্চয়তার মুখে। কেননা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ হলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যেতে পারে এবং সেই সঙ্গে ইরান-ইসরায়েলের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একমাত্র সমুদ্রপথ হলো হরমুজ প্রণালি। এর এক পাশে ইরান, অন্যপাশে ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বের জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সংস্থাটি একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ’ বলে বর্ণনা করেছে। এই প্রণালির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় তেল যায়। প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত হলেও এর ভেতরের নৌ-চলাচল পথ আরও সংকীর্ণ, ফলে এটি হামলা বা অবরোধের হুমকির জন্য সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ।

সংঘাতের সময় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হামলা চালিয়ে চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নতুন নয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে উভয় দেশ উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছিল। ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত সেই সময়েও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার সময় হরমুজের কাছে ফুজাইরাহ উপকূলে চারটি জাহাজে হামলা হয়। ওই ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান তা অস্বীকার করে। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও আরব উপদ্বীপের বিপরীত পাশে বাব আল-মানদেব প্রণালিতে একাধিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। হুতিদের এসব হামলায় লোহিত সাগর দিয়ে নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হলেও বিকল্প হিসেবে আফ্রিকার চারপাশ ঘুরে দীর্ঘ পথে যাতায়াত সম্ভব। কিন্তু পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি ছাড়া কোনো জাহাজের সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার পথ নেই। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল আমদানিকারক দেশগুলো নয়, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সব দেশই অর্থনৈতিক চাপে পড়বে।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি হচ্ছে ইরানের জ¦ালানি তেল রপ্তানির প্রধান রুট। ইরানের অর্থনীতির জন্য এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের মোট রপ্তানি আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ আসে জ¦ালানি তেল রপ্তানির মাধ্যমে। ২০১৭ সালে ইরান ৬৬০০ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি করেছে। ফলে অর্থনৈতিক কোণ থেকে এটি তেহরানের জন্যও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইরানি সংসদ সদস্যের হুমকি সত্ত্বেও, এটি এখনো স্পষ্ট নয় যে তেহরান আদৌ প্রণালিটি বন্ধ করার মতো সামর্থ্য কিংবা রাজনৈতিক সদিচ্ছা রাখে কি না। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য নৌ-সামরিক উপস্থিতির কারণে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের মতো পদক্ষেপের জবাবে সেখান থেকে প্রতিক্রিয়া আসা প্রায় নিশ্চিত। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে এতে যুক্তরাষ্ট্রও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এর জবাবে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামরিক প্রতিক্রিয়া আসার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও ইরান এখনই হরমুজ প্রণালি বন্ধের সুনির্দিষ্ট হুমকি দেয়নি, তবে ইরানি সংসদ সদস্য এসমাইল কোসারির সাম্প্রতিক মন্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, সংঘাত চলাকালে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হামলার বিষয়টি তেহরান সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে। এর আগে, ২০২৪ সালের এপ্রিলেও ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে একটি কনটেইনার জাহাজ জব্দ করে। তার কিছুদিন আগে, সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলি হামলায় একাধিক কর্মকর্তা নিহত হন। এর জবাবে ইরান সীমিত পাল্টা হামলা চালায় এবং ইসরায়েলও পাল্টা জবাব দেয়। ওই সময়ই ছিল দুপক্ষের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ।

জাহাজ পাঠাতে অনীহা

ইরানে ইসরায়েলের হামলার জেরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে নতুন করে জাহাজ পাঠানোর চুক্তি থেকে সরে আসছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ তালিকাভুক্ত তেলবাহী ট্যাংকার কোম্পানি ফ্রন্টলাইন। শুক্রবার সংঘাত শুরুর পর বৈশ্বিক শিপিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেবে এমন আশঙ্কার প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে ফ্রন্টলাইনের প্রধান নির্বাহী লার্স বারস্টাডের এই সিদ্ধান্তকে। উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্তকারী ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি এখন সবার উদ্বেগের কেন্দ্রে। বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেলের জোগান এবং এক-তৃতীয়াংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এ পথেই পরিবাহিত হয়। এ ছাড়া দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরকেন্দ্রিক কনটেইনার জাহাজ চলাচলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ রুট।

বারস্টাড বলেন, এই অঞ্চলে ঢোকার জন্য এখন খুবই কমসংখ্যক মালিক চার্টার নিচ্ছেন। আমরা এখন আর উপসাগরে ঢোকার চুক্তি করছি না। সমুদ্র নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও বলছেন, জাহাজ মালিকরা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলতে চাইছেন, কারণ এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বারস্টাড জানান, ফ্রন্টলাইন কোম্পানির একাধিক ট্যাংকার আগে থেকেই উপসাগরে অবস্থান করছে এবং সেগুলো নিরাপত্তা জোরদার করে, আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নিরাপত্তা বহরের সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রণালি পেরিয়ে বের হয়ে আসবে। তিনি বলেন, বাণিজ্য এখন আরো অকার্যকর হয়ে উঠবে এবং নিশ্চয়ই নিরাপত্তারও মূল্য আছে।

ইরান এই রুটে চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এমনকি দেশটি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের (ইরান-সমর্থিত) লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলার মাত্রা বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ইরানের বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালির কাছ থেকে এমএসসি এরিয়াস নামের একটি কনটেইনার জাহাজ আটক করে তা ইরানের জলসীমায় নিয়ে যায়। জাহাজটি ছিল ইসরায়েলের ওফার পরিবারের নিয়ন্ত্রিত জোডিয়াক মেরিটাইমের সঙ্গে সংযুক্ত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোরটাল শিপিংয়ের মালিকানাধীন। ২০২৩ সালের শেষদিকে হুতিদের হামলা শুরু হলে অনেক বড় শিপিং কোম্পানি এশিয়া-ইউরোপের প্রচলিত সুয়েজ খাল ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে বিকল্প পথে যাওয়া শুরু করে। সরবরাহ শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ড বলেন, চলমান উত্তেজনার কারণে কনটেইনার জাহাজগুলোর নিয়মিত পথে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। শিল্পজাত পণ্য পরিবহনকারী কনটেইনার শিপিং কোম্পানিগুলো বিশেষভাবে লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলে অনাগ্রহী। স্যান্ড আরও বলেন, যদি জাহাজ কোম্পানিগুলো দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরকে হাব হিসেবে বাদ দিয়ে উপসাগরের বাইরে কম সুবিধাসম্পন্ন বন্দরে যাওয়া শুরু করে, তাহলে অনিবার্যভাবেই শিপিং বিঘ্নিত হবে এবং বন্দরজট সৃষ্টি হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ইরান হরমুজ প্রণালিতে কার্যত এক ধরনের অঘোষিত অবরোধ আরোপ করতে পারে। তবে বারস্টাড মনে করেন, ইরান সম্পূর্ণভাবে জলপথটি বন্ধ করবে না। কারণ তেল রপ্তানির ওপর দেশটির প্রবল নির্ভরতা রয়েছে। তিনি বলেন, তারা নিজেদের অর্থের উৎস নষ্ট করতে চাইবে না। তবে তিনি এও বলেন, হামলার পর ইরানের স্বাভাবিক তেল উৎপাদন

ব্যাহত হতে পারে। যার ফলে চীনসহ ইরাননির্ভর দেশগুলোকে বিকল্প উৎসে যেতে হতে পারে।