সাগর মানবজাতির কাছে এক অপার বিস্ময়ের নাম। সাগরতলের রহস্য এখনো মানুষকে চুম্বকের মতোই আকর্ষণ করে। তেমনই রোমাঞ্চকর এক নতুন আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। মহাসাগরে থাকা ২৩০টি বিশালাকার ভাইরাস শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা; যা আগে কখনো দেখা যায়নি। যার মধ্যে কিছু ভাইরাস সামুদ্রিক খাদ্য শৃঙ্খলে ও মানব স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে দাবি তাদের। ভাইরাসের আকার নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগে থাকা অনুমানের চেয়েও বড় এবং জটিল এসব নতুন ভাইরাস। এগুলোর খোঁজ পেয়েছেন ‘ইউনিভার্সিটি অব মায়ামির রোসেনস্টিয়েল স্কুল অব মেরিন, অ্যাটমসফেরিক অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স’-এর গবেষকরা।
বিশালাকার এসব ভাইরাস দৈনন্দিন জীবনে শোনা সাধারণ ভাইরাসের মতো নয়। এগুলো ‘প্রোটিস্ট’ নামে পরিচিত এককোষী সামুদ্রিক জীবকে সংক্রমিত করে, যার মধ্যে রয়েছে শৈবাল, অ্যামিবা ও ফ্লাজেলেট। সামুদ্রিক খাদ্য শৃঙ্খলের সবচেয়ে নিচের স্তরে থাকে শৈবাল, অ্যামিবা ও ফ্লাজেলেটের মতো এসব ক্ষুদ্র এককোষী জীব। এগুলোর ওপর নির্ভর করে আরও বড় নানা প্রাণীর জীবনধারা। ফলে এগুলো বিশালাকার ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এদের সংখ্যা বা কার্যক্রম পরিবর্তন হতে পারে, যা পুরো খাদ্য শৃঙ্খলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
গবেষকরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর শৈবাল জন্মাতে ভূমিকা রাখে এসব ভাইরাস। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে শৈবালের অস্বাভাবিক ও দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। এতে মহাসাগরের পানির গুণমান নষ্ট হয়, পানি বিষাক্ত হয়ে ওঠে, মাছ মারা যায় ও তা মানব স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। গবেষণার জন্য উচ্চ সক্ষমতার কম্পিউটার ব্যবহার করে উত্তর মেরু বা আর্কটিক থেকে শুরু করে গ্রীষ্ণমণ্ডল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন মহাসাগর থেকে সংগ্রহ করা বিশাল আকারের ডিএনএ তথ্য বিশ্লেষণ করেছে গবেষক দলটি। এত সব বিশাল ও জটিল ডেটাসেটের ভেতর থেকে বিশালাকার ভাইরাসের জিনোম বা ডিএনএর গঠন খুঁজে বের করতে ‘বিইআরইএন’ নামের বিশেষ এক কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করেছেন গবেষকরা, যা এসব নতুন ভাইরাস খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে তাদের। বর্তমানে বিশ্বের বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত বিইআরইএন কম্পিউটার প্রোগ্রামটির মাধ্যমে রহস্যময় এসব ভাইরাসকে শনাক্ত করা ও এ নিয়ে গবেষণা করা অনেক সহজ হয়েছে গবেষকদের জন্য। গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নালে ‘নেচার এনপিজে ভাইরাসেস’।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘রোসেনস্টিয়েল স্কুল অব মেরিন, অ্যাটমসফেরিক অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স’-এর পিএইচডি শিক্ষার্থী বেঞ্জামিন মিনচ বলেছেন, এসব ভাইরাসে এমন জিন থাকে, যা কেবল জ্যান্ত কোষেই মেলে। যার মানে হচ্ছে, এসব ভাইরাস এদের সংক্রমিত জীবের বিপাক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা সমুদ্রে কার্বন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ওপর প্রভাব ফেলে। সহজ ভাষায় বললে, এসব ভাইরাস শুধু সংক্রমণকারী নয়, বরং এরা পৃথিবীর সমুদ্রের রসায়নেও গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় এক খেলোয়াড়।