আরইবি-পিবিএস দ্বন্দ্ব নিরসনে আরও দুই কমিটি

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) কর্মীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নিরসনে পৃথক দুটি কমিটি গঠন করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ ছাড়া আরইবি ও পিবিএসের ভূমিকা এবং বিদ্যমান পল্লী বিদ্যুতায়ন কাঠামো পর্যালোচনার নিমিত্তে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিকে দ্রুত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আরইবি ও পিবিএসের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রতিককালে তা প্রকট আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ বিভাগের এমন উদ্যোগে সুষ্ঠু সমাধান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মঙ্গলবার গঠিত পাঁচ সদস্যের ওই কমিটির নেতৃত্বে আছেন বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন)। একইদিন বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিবকে (বাজেট অধিশাখা) আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির কাজ হলো পিবিএসের সব চুক্তিভিত্তিক ও অনিয়মিতদের চাকরি নিয়মিত করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা। পাশাপাশি পিবিএসের কর্মীদের বিরুদ্ধে আরইবির করা ব মামলা প্রত্যাহারপূর্বক চাকরিচ্যুতদের স্বপদে পুনর্বহাল এবং সংযুক্ত ও সাময়িক বরখাস্তকৃত এবং অন্যায়ভাবে বদলি করা কর্মীদের পদায়নের বিষয়টি সংবেদনশীলতা ও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনার সুপারিশ করার কাজ করবে এ কমিটি।

এদিকে বিদ্যমান পল্লী বিদ্যুতায়ন কাঠামো পর্যালোচনার জন্য ব্র্যাক বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ ফারহাত আনোয়ারকে সভাপতি করে এর আগে গঠিত কমিটিতে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া তাগিদ দিয়ে গতকাল চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

ওই চিঠিতে বলা হয়, আরইবি ও পিবিএসের ভূমিকা এবং বিদ্যমান পল্লী বিদ্যুতায়ন কাঠামো পর্যালোচনার নিমিত্তে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির পক্ষ থেকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ও ১ জুন দুটি উপস্থাপনা পেশ করা হয়। ওই উপস্থাপনার ওপর উপস্থিত অংশীজনের কাছ থেকে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। এসব মতামতের যৌক্তিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে কমিটির কার্যপরিধি অনুযায়ী চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় পিবিএসগুলোতে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে কমিটিকে যৌক্তিক মতামতগুলো অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের ওই চিঠিতে।

আরইবি চেয়্যারম্যানের অপসারণসহ নিজেদের বিভিন্ন বঞ্চনা, জুলুম নির্যাতন বন্ধের দাবিতে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে কর্মবিরতিসহ দেশ জুড়ে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন দেশের সবচেয়ে বড় এ বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মীরা। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও আন্দোলন করেছেন তারা।

তাদের অন্য দাবিগুলো হলো এক ও অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরইবি-পিবিএস একীভূতকরণ অথবা দেশের অন্য বিতরণ সংস্থার ন্যায় পুনর্গঠন; মিটার রিডার, লাইন শ্রমিক ও পোষ্য কর্মীদের চাকরি নিয়মিত করা; মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করে চাকরিচ্যুতদের স্বপদে পুনর্বহাল; সব হয়রানি ও শাস্তিমূলক বদলি আদেশ বাতিল এবং বরখাস্ত ও সংযুক্ত কর্মীদের অবিলম্বে পদায়ন; জনবলের ঘাটতি পূরণ এবং পূর্ণাঙ্গ সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ড গঠন করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত করা।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করলেও তাদের ন্যায্য দাবি মানা হচ্ছে না। উল্টো তাদের ওপর আরইবি নানারকম দমন-নিপীড়ন চালাচ্ছে। এবার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।

গ্রামাঞ্চলসহ দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা আরইবি। বর্তমানে দেশে ৪ কোটি ৮২ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে আরইবির গ্রাহক রয়েছে ৩ কোটি ৬৮ লাখ। সারা দেশে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। আরইবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি একীভূতকরণ এবং অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়নসহ চুক্তিভিত্তিক ও অনিয়মিত কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে গত বছর জানুয়ারি থেকে আন্দোলন কর্মসূচি চলছে।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, নায্য দাবির কথা বলতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ২৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ৪০ জন সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। ছয় হাজারের বেশি কর্মীকে নিজ এলাকা থেকে দূরের এলাকায় বদলি করেছে আরইবি। এ ছাড়া সমিতির অন্তত ১৭২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বেশ কয়েক মাস পর তারা জামিন নিয়েছেন।

পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা জানান, ন্যায্য দাবি আদায়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের আন্দোলনের একপর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ^াসে গত বছর ২৭ আগস্ট আন্দোলন সাময়িক স্থগিত করা হয়। এরপর ১৭ অক্টোবর ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত এবং ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেয় আরইবি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ৬১টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে ৩৩ জেলার প্রায় দুই কোটি গ্রাহক চরম দুর্ভোগে পড়েন। পরে সরকারের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করে আন্দোলন স্থগিত করেন। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বন্ধের ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করে তারা ক্ষমা চেয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার আগে নিয়ম অনুযায়ী নোটিস দেওয়া এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া মানার কথা থাকলেও আরইবি তা মানেনি।