বাংলাদেশে প্রতি তিনজনে একজন, অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে প্রায় এক কোটি মানুষ ফ্যাটিলিভারজনিত সিরোসিস বা লিভার ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। অথচ শুধু খাদ্যাভ্যাস, হাঁটার অভ্যাস ও জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন এবং ওজন কমানোর মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার ও ফ্যাটি লিভারের বিপজ্জনক পরিণতি নন-অ্যালকোহলিক স্টিটোহেপাটাইটিস বা ন্যাশ প্রতিরোধ করা যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) এক সেমিনারে এই তথ্য জানানো হয়।
সেমিনারে বলা হয়, যারা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার বিশেষত ভাত বেশি গ্রহণ করছে এবং সেই তুলনায় শারীরিক পরিশ্রম বা হাঁটা-চলাফেরা কম করছে, তাদের ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বাইরের খাবার গ্রহণ, দিনে পাঁচ ঘণ্টার ওপরে যাদের বসে থাকতে হয় এবং একই সঙ্গে কায়িক পরিশ্রম কম তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
বিশ্ব ফ্যাটিলিভার দিবস উদযাপন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ‘কম খাই হাঁটি বেশি, ফ্যাটি লিভার দূরে রাখি’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে হেপাটোলজি সোসাইটি।
সেমিনারে চিকিৎসকরা জানান, লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ লিভারে চর্বি জমাজনিত প্রদাহ। অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়ার কারণে যকৃতে যে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, তাকে স্টেটোহেপাটাইটিস বলা হয়। ফ্যাটি লিভারের বিপজ্জনক পরিণতি হচ্ছে নন-অ্যালকোহলিক স্টিটোহেপাটাইটিস বা ন্যাশ। নির্ণয়হীন ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ফ্যাটি লিভার বিপজ্জনকভাবে ন্যাশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করা ছাড়াও যকৃতে চর্বি জমার আরও বেশ কিছু খারাপ দিক রয়েছে। এই রোগটি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং শরীরে ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও এ রোগের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ও ফেলো বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স মেজর জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. এ এস এম মতিউর রহমান বলেন, ফ্যাটি লিভারকে মাল্টি ডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মাল্টি সেক্টরকে যুক্ত করে সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। এই রোগ প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে, বিশেষ করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি কমিউনিটিকেও যুক্ত করে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি নিতে হবে। ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে শৈশবকালীন থেকেই সবাইকে সচেতন হতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধই প্রধান চিকিৎসা। মাত্র একটি পরীক্ষা করেই এই রোগ চিহ্নিত করা সম্ভব। ফ্যাটি লিভারের ধরন অনুযায়ী রোগীদের স্বার্থে বিজ্ঞান সম্মতভাবে চিকিৎসা দিতে হবে। রোগটি প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যেতে হবে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ : ফ্যাটিলিভার প্রতিরোধে সেমিনারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, প্রত্যেক ব্যক্তির সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন এবং প্রতিদিন অন্তত ত্রিশ মিনিট করে হাঁটতে হবে। দড়ি লাফ এবং সাইকেল চালানো শরীরচর্চার জন্য ভালো। দুধ, ফল, শাকসবজি খাওয়া বাড়াতে হবে। চিনিযুক্ত খাবার, কোমলপানীয়, চকলেট, আইসক্রিম, ফাস্ট ফুড ও ভাজা খাবার পরিহার করে ট্রান্স-ফ্যাটের পরিমাণ কমাতে হবে। এভাবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে ক্যালরি গ্রহণ কমাতে হবে।
চিকিৎসকরা আরও পরামর্শ দেন শরীরচর্চা বাড়ানো যায়, এ রকম পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রতিটি স্কুল এবং প্রশাসনিক ওয়ার্ডে খেলার মাঠ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং প্রতিটি শিশুকে খেলতে এবং অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত করতে হবে। মেইন রোডের পাশে বাইসাইকেল চালানো এবং হাঁটার জন্য আলাদা লেন তৈরি করা, যা স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি উভয়ের জন্য উপকার হবে। গণসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অধিক স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি এবং লবণযুক্ত জাংকফুড এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করতে উৎসাহিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাবারের পুষ্টিমান সঠিক রাখার জন্য (যেমন ট্রান্স ফ্যাট, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি ও লবণ পরিহার) খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের অধীনে আনতে হবে। সফট ড্রিংকসের পরিবর্তে ফ্রেস ফলের জুস এবং পানি পানকে উৎসাহিত করতে হবে। ছোট-বড় সবার জন্য পার্ক, খেলার মাঠ, স্কুল ও কর্মস্থলে পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রে প্যাকেটের গায়ে পুষ্টিমান এবং শক্তিমান (ক্যালরি) উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সব চিকিৎসককে ফ্যাটি লিভার-সংক্রান্ত পর্যাপ্ত জ্ঞান দিতে ও রোগটির ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দিকে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে তারা ন্যাশের ঝুঁকিতে না পড়ে। ব্যবহার ও প্রয়োগ কমানোর জন্য ‘চর্বি বা চিনি কর’ (ফ্যাটি ট্যাক্স) ধার্য করার চিন্তা করা যেতে পারে।