গলে সমুদ্র তখন নিশ্চুপ। বাতাসে নরম আর্দ্রতা। ক্রিজের পাশে ছায়া লেগে আছে বিকেলের। বাংলাদেশি বোলারদের ঘূর্ণিতে যেন পথ হাতরাচ্ছেন শ্রীলঙ্কার ব্যাটসমন্যারা। ঠিক তখনই এক অন্যরকম দৃশ্য—একটি ধীর লয়, ক্ষণিক বিভ্রান্তি, ব্যাটারের গ্লাভস ছুঁয়ে বল চলে গেল সিলি পয়েন্টে থাকা মুমিনুল হকের হাতে। আর থেমে গেল এক কিংবদন্তির ক্যারিয়ার। ক্যারিয়ারে শেষ ইনিংসটি সমাপ্ত করলেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস।
শুধু একটি ইনিংস নয়, যেন একটি যুগ থেমে গেল গলে। তাইজুল ইসলামের স্পিনে মাত্র ৮ রানে ফিরলেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসের এক নিশ্চুপ সিংহ। এই মাঠেই তার অভিষেক হয়েছিল ২০০৯ সালে। ১৬ বছরের টেস্ট যাত্রা ঘুরে আবার সেই গলেই ফিরলেন ম্যাথিউস—তবে এবার আর শুরু নয়, আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে নিলেন চিরবিদায়।
যখন তিনি প্যাভিলিয়নের দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন, স্ট্যান্ডে কেউ বাঁশি বাজায়নি, কেউ হুল্লোড় করেনি। ছিল এক অপার্থিব নীরবতা। যেন গ্যালারির প্রতিটি হৃদয় তখন জানত, এই দৃশ্য আর কখনো ফিরে আসবে না। সতীর্থরা থমকে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছেন, বাংলাদেশি ক্রিকেটাররাও কুর্নিশ করেছেন—নীরবভাবে বিদায় জানিয়েছে সময় নিজেই।
অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস ছিলেন না চোখধাঁধানো সুপারস্টার। তিনি বর্ণময়তার ছায়ায় গড়া এক স্থির আলো। তার ব্যাট ছিল ধ্রুপদী। ধৈর্য, টেম্পারামেন্ট আর লড়াইয়ের অসাধারণ প্রতিমা হয়ে থাকবেন তিনি টেস্ট ক্রিকেটের পাঠ্যপুস্তকে। ২০১৪ সালে হেডিংলিতে সেই অবিস্মরণীয় শতক, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয়, কিংবা ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে ৩-০ তে ধুলিস্যাৎ করা—সেই সব মুহূর্তে তিনি ছিলেন সামনে, নেতৃত্বে, ব্যাটে, হৃদয়ে।
তার ১১৯ টেস্টে ১১২ ইনিংসে ৮,২১৪ রান, গড় ৪৪, সর্বোচ্চ ২০০, ১৬টি শতক, ৪৫টি ফিফটি—এই তালিকা তাকে শ্রেষ্ঠদের পঙক্তিতে তুলে ধরে। ফিল্ডে তার ৭৮টি ক্যাচ, স্পিন-বোলিংয়ে ৩৩ উইকেট (৮৬ ইনিংসে), সর্বোচ্চ এক প্রদর্শনী হিসেবে ৪ উইকেট নেয়ার রেকর্ড, গড় ৫৪.৪৮ ও ইকোনমি ২.৭১। অধিনায়ক হিসেবে ৩৪টি টেস্টে নেতৃত্ব।
তবে চোট তাকে কখনো অলরাউন্ডারের পূর্ণ প্রতিভা উপহার দেয়নি। হাঁটুর আর্থপ্যাথি, হ্যামস্ট্রিংয়ের খুচরো আঘাত, প্যেলভিক সমস্যা–ম্যাথিউসের বোলিং ক্যারিয়ার সেসবেই পাগল, হুঁশিয়ারী করে দিলো যে জীবনের দুর্দান্ত এক অধ্যায় কি করে অমলিন হয়ে ওঠে।
চোটের ছায়া না হতো, হয়তো সে আরও তিন-চারটি ইনিংসের র্বর্তমানে এক অলরাউন্ডার হিসেবেই স্মরণীয় হতে পারতো। তবে কঠিন ফিল্ডিং, দীর্ঘ ক্যারিয়ার–সব মিলিয়ে কাজেই ফোকাস হয়ে যায় ব্যাটে, আর বোলিং যেন হয় মাঝের পথেই থেমে যাওয়া স্মৃতি।
ম্যাথিউসের ক্যারিয়ার ঘিরে রয়েছে একাধিক বিতর্ক। ভারতে সবশেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘টাইমড‑আউট’–এর ঘটনা যেন ক্রিকেট ইতিহাসে এক নীরব কাঁপন রেখে যায়। প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে এমন বিষয়ই ঘটেছিল। হেলমেটের স্ট্র্যাপ ভেঙে যাওয়ায় তিনি সময় নিয়ে করছিলেন, তখনই সাকিব আল হাসান আপিল করেন এবং ম্যাথিউস রেকর্ডবুকের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ‘টাইমড‑আউট’ হন।
২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কা এশিয়া কাপে খারাপ পারফর্ম করে। ম্যাথিউস অধিনায়ক ছিলেন এবং তিনি ও তার ফিটনেসকে দায়ী করে তাকে অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, তাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। এমনকি সেসময় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক কিছুটা টানাপড়েনের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ফলাফল বোর্ড বনাম সিনিয়র খেলোয়াড় দ্বন্দ্ব।
ম্যাথিউসের ফিটনেস ছিল বোর্ডের কাছে উদ্বেগের। তার রানিং বিটুইন দ্য উইকেট নিয়ে অভিযোগ ছিল তিনি ধীর, এবং পার্টনারদের আউট করে ফেলতেন। এই ইস্যুতে তাকে ওয়ানডে দল থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল এক পর্যায়ে। তিনি বলেন, ‘আমি তো ক্রিকেটার, অ্যাথলেট না’। কয়েকটি টেস্টে আউট হওয়া বা রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ২০১৮ ও ২০২১ সালে আম্পায়ারের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিমা, শরীরী ভাষা ইস্যুতে সতর্ক করা হয়েছিল।
২০২১ সালে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড কেন্দ্রীয় চুক্তির নতুন কাঠামো দেয়, যেখানে পারফরম্যান্স ভিত্তিক বেতনের প্রস্তাব ছিল। ম্যাথিউস এই শর্তে অসন্তুষ্ট হয়ে অবসরের কথা ভাবলেও শেষপর্যন্ত ফিরে আসেন।
আজ নিজেই স্মৃতির পাতায় ফিরে ম্যাথিউস বলেন, ‘এই যাত্রা সহজ ছিল না। ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ। টেস্ট ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় ফরম্যাট। বিদায় বলছি, যেন এক অংশ হারিয়ে যাচ্ছে আমার ভিতর থেকে।’
অবসরের পর আবেগঘন এক বার্তায় ম্যাথিউস বলেন, ‘আমি অভিভূত। টেস্ট থেকে অবসর নেওয়ার পর যেভাবে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। এটা ছিল সহজ পথ নয়—উত্থান-পতনে ভরা দীর্ঘ এক যাত্রা। তবে সবার ভালোবাসা ও সমর্থন আমাকে চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। টেস্ট ফরম্যাট আমার সবচেয়ে প্রিয়, এখান থেকেই সরে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। এখন সময় নতুন প্রজন্মের হাতেই ব্যাটন তুলে দেওয়ার।’
ম্যাথিউস কৃতজ্ঞতা জানান বাংলাদেশের প্রতি, যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক ম্যাচ উপহার দিয়েছে, ‘বাংলাদেশকে অভিনন্দন। শান্ত, মুশফিক দারুণ ব্যাট করেছে। নিসাঙ্কাও দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছে। ইংল্যান্ডের মাটিতে ঐতিহাসিক জয় কিংবা শ্রীলঙ্কায় অস্ট্রেলিয়াকে ৩-০তে হোয়াইটওয়াশ করা—এই স্মৃতিগুলোই আমার ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত।’
আজ টেস্ট ক্রিকেট আরেক শিল্পীকে হারাল। কিন্তু হারিয়ে গেল না তিনি। সাদা পোশাক, নিঃশব্দ ব্যাট, অটুট ধৈর্য আর অফস্পিনে কটবিহীন চোয়াল—সব মিলিয়ে ম্যাথিউস রয়ে গেলেন ইতিহাসের পাতায়, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট মানচিত্রে, আর বিশ্ব ক্রিকেটপ্রেমীর হৃদয়ে।