ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সমরসজ্জা

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। দুই পক্ষের এই যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে তেহরান, হাইফা ও বিরশেবা শহরে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় শত শত মানুষ হতাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে নেওয়া কূটনৈতিক উদ্যোগে উত্তেজনা কমার মতো কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। উল্টো মধ্যপ্রাচ্যের এ দুই দেশের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার অনুমোদন দিলেও, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়াবে কি না।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন একসময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় ব্যাপক সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করেছে এবং ইরান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংঘর্ষ প্রশমন প্রচেষ্টার ওপর চাপ তৈরি করেছে। রয়টার্স বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি ইসরায়েলের বিমান হামলায় যুক্ত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা দেশটির বহু সামরিক ঘাঁটি থেকে ইরানে হামলা চালানো হবে। ফলে এসব ঘাঁটিই ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে। যেসব ঘাঁটি সম্ভাব্য ইরানি হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখান থেকে ইতিমধ্যে কিছু বিমান ও জাহাজ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে বুধবার রয়টার্সকে জানান যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস একটি সতর্কবার্তা জারি করে, অস্থায়ীভাবে তাদের কর্মীদের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক স্থাপনা, যা দোহার বাইরে মরুভূমিতে অবস্থিত। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে এফ-১৬, এফ-২২ এবং এফ-৩৫-সহ আরও কিছু যুদ্ধবিমান মোতায়েন শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানান, এই বাহিনী ড্রোন ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে নামিয়ে কর্মী এবং স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা দিতে পারবে। ইউরোপে এই সপ্তাহের শুরুতে বেশ কিছু ট্যাংকার বিমান পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসএস নিমিৎজ বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়েছে, যা আগে থেকে মোতায়েনকৃত ইউএসএস কার্ল ভিনসনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ায় বি-৫২ বোমারু বিমানসহ অন্যান্য যুদ্ধবিমান দেখা গেছে। ইরানে হামলায় ইসরায়েলের কেন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন?

ইরানের আকাশসীমায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ থাকায় তারা বিস্তৃত বোমাবর্ষণ চালাতে পারছে, তবে দেশটির ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া পেরে উঠবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা। তবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বলছে, ইসরায়েলের বিমান হামলায় স্থাপনাটির তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি এখনো দৃশ্যমান হয়নি। রয়টার্স বলছে, পর্বতের নিচে মাটি খুঁড়ে বানানো ফোরদো স্থাপনায় ইরানের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল অংশ উৎপাদিত হয়, যা আরও পরিশোধন করে অস্ত্রে রূপান্তর করা সম্ভব। এই স্থাপনার মূল অংশ প্রায় ৮০-১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত, যেখানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকার বাস্টার বোমার মাধ্যমেই পৌঁছানো সম্ভব। নাতাঞ্জ ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্ট ফোরদোর চেয়েও গভীরে অবস্থিত। আইএইএ বলছে, ইসরায়েলের আগের হামলায় স্থাপনাটির বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধকরণ যন্ত্রপাতি (সেন্ট্রিফিউজ) কার্যত অকেজো হয়ে গেছে। তবে পুরো স্থাপনাটি ধ্বংস করার ক্ষমতা ইসরায়েলের একার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেন যে যুক্তরাষ্ট্র ফোরদোর মতো স্থাপনায় হামলা চালাবে, তবে তিনি ইউএস এয়ার ফোর্সের বি-২ স্পিরিট স্টেলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করতে পারেন। এই বোমারু বিমান তার স্টেলথ বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই বিশাল ওজনের গোলাবারুদ বহনে সক্ষম, যার মধ্যে দুটি জিবিইউ-৫৭এ/বি এমওপি (ম্যাসিভ অর্ডিন্যান্স পেনিট্রেটর) বা ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের নির্ভুলভাবে পরিচালিত ‘বাংকার বাস্টার বোমা’ বহন করতে পারে।

এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রচলিত বোমা, যা শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ বাংকার ধ্বংসের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এটি ২০ দশমিক ৫ ফুট লম্বা, জিপিএসনির্ভর টার্গেটিং ব্যবস্থার সাহায্যে নির্দিষ্ট ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় নিখুঁত হামলা করতে সক্ষম। শক্ত কংক্রিট ভেদ করে এটি ৬০ মিটার (২০০ ফুট) পর্যন্ত ঢুকে যেতে পারে, যা বিশে^র সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থাপনাগুলো ধ্বংসে কার্যকর। ফোরদো স্থাপনাটি যদি ১০০ মিটার গভীরে হয়ে থাকে, তবে এমন একাধিক বোমা এক জায়গায় বারবার ফেললে তা ধ্বংস হতে পারে। ২০১২ সালের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থাপনাটিতে সরাসরি পৌঁছানো না গেলেও সেন্ট্রিফিউজগুলো ধ্বংস বা অকার্যকর করা যেতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, সেন্ট্রিফিউজগুলো ঝাঁকুনির প্রভাব এবং বিস্ফোরণ থেকে ঠিক কীভাবে সুরক্ষিত আছে। কেননা এমন শক্তিশালী বোমা দিয়েও ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনা সফলভাবে ধ্বংস করার নিশ্চয়তা পুরোপুরি নেই। কিংস কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র লেকচারার আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভারী বাংকার বাস্টার বোমাও ইরানের সবচেয়ে গভীর স্থাপনাগুলোর ক্ষতি করতে ব্যর্থ হতে পারে। ট্রাম্প যদি এ হামলায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেনও এমন পরিস্থিতিতে স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে কমান্ডো ধাঁচের বিশেষ বাহিনীকে মাটির নিচে অভিযান চালাতে হবে। কেন ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের নিশানায় ফোরদো সম্প্রতি প্রকাশিত আইএইএর প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ইরান ফোরদো স্থাপনায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উৎপাদন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সেখানে বর্তমানে ২ হাজার ৭০০টি সেন্ট্রিফিউজ রয়েছে বলে আইএইএ ও বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন। ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ফোরদোতে ইরান তাড়াহুড়া করে মজুদ করা ইউরেনিয়াম থেকে পারমাণবিক বোমা বানানোর চেষ্টা করতে পারে। ইসরায়েল এই কেন্দ্র লক্ষ্য করে সম্প্রতি হামলা চালালেও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার মতে, তারা এখন পর্যন্ত এ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি। তেহরান বহুদিন ধরে দাবি করে আসছে, শুধু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। কিন্তু তারপরও ফোরদো নিয়ে ইরানের প্রকৃত অভিপ্রায় সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বে প্রশ্ন থেকেই গেছে। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এক যৌথ ঘোষণায় প্রথমবারের মতো ফর্দোর অস্তিত্বের কথা প্রকাশ করেন। ২০১৫ সালে ‘ইরান পারমাণবিক চুক্তি’ নামে পরিচিত জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) করা হয়। এ চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে ফোরদোর ভেতর থেকে দুই-

তৃতীয়াংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের যন্ত্র বা সেন্ট্রিফিউজ সরাতে হয় এবং সব ধরনের পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নিতে হয়। ফলে ফোরদো থেকে বিপদের আশঙ্কা অনেকটা প্রশমিত হয়। এরপর এ স্থাপনায় এমন কর্মকাণ্ড পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার পর পরিস্থিতি আবার পাল্টে যেতে শুরু করে। ২০১৮ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ইরানের কথিত পারমাণবিক আর্কাইভ থেকে ৫৫ হাজারের বেশি গোপন নথি উদ্ধার করেছে। এতে ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনার বিস্তারিত নকশা ছিল। এ ছাড়া ফোরদো লক্ষ্য সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া গেছে এসব নথিতে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ফোরদোর লক্ষ্য ছিল প্রতিবছর এক বা দুটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব হয়, এমন মাত্রায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা।

বিশ্লেষণকারী বিশেষজ্ঞ আলব্রাইট বলেন, এটা দেখে মনে হচ্ছে, ইরান এমনভাবে কাজ করছে, ভবিষ্যতে যদি পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায়, তাহলে যেন তারা তৈরি থাকে। আর যদি কেউ ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করতে পারে, তাহলে সেটা খুব সহজেই অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা যায়। আইএসআইএস নামে একটি চিন্তক প্রতিষ্ঠান বলছে, ইরান ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় মাত্র ৩ সপ্তাহে ২৩৩ কেজি অস্ত্রমান ইউরেনিয়াম তৈরি করতে পারে, যা ৯টি পারমাণবিক বোমার জন্য যথেষ্ট। যুক্তরাজ্যের একটি প্রখ্যাত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রুসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিবিইউ ৫৭/বি বোমা দিয়েও ফোরদোর মতো স্থাপনায় প্রবেশ করতে হলে সম্ভবত একাধিকবার ঠিক একই জায়গায় আঘাত হানতে হবে। তবেই ভেতরে ঢোকার মতো কোনো বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।