কনস্টেবলের পা হারানোর কারণ খুঁজছে পুলিশ

চট্টগ্রামে সংকেত অমান্যকারী বাইক আরোহীকে ধরতে গিয়ে ধীর গতির একটি ট্রাকের নিচে পড়ে পা হারিয়েছেন মো. আলাউদ্দিন (৩০) নামের পুলিশের এক কনস্টেবল। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার ওই ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ ঘটনায় কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের ‘অতি উৎসাহ’কে দায়ী করেছেন। তবে পুলিশ দুষছে, ট্রাকের চালক, সহকারী এবং দুজন বাইক আরোহীকে।

লোহাগাড়া থানা সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া চারজন হলেন ট্রাকচালক পটিয়া উপজেলার মালিয়ারা গ্রামের মো. শহিদুল ইসলাম (২৬), চালকের সহকারী বাঁশখালী উপজেলার বাঁশখালা গ্রামের আলী হায়দার (২০), মোটরসাইকেলের চালক সাতকানিয়া উপজেলার দক্ষিণ ছদাহা গ্রামের ওমর ফারুক তৌহিদ (২২) এবং লোহাগাড়া উপজেলার মো. হাসান (২৪)।

আলোচিত ওই দুর্ঘটনায় লোহাগাড়া থানা-পুলিশ সড়ক পরিবহন আইনে মামলাও করেছে। ‘অভিযুক্ত’ চারজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। কিন্তু এরপরই প্রশ্ন উঠেছে ওই দুর্ঘটনায় দায় আসলে কার? অবশ্য পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজটি বিশ্লেষণ করে খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাই বলছেন, দুর্ঘটনায় পুলিশের দোষে কনস্টেবল আলাউদ্দিন ট্রাকের নিচে পা হারিয়েছেন। তবে চেকপোস্টে পুলিশের সংকেত অমান্য করে সড়ক পরিবহন আইন লঙ্ঘন করেছেন বাইকচালক। গ্রেপ্তার বাইক আরোহীদের পরিবারের ভাষ্য, পুলিশের সংকেত অমান্য করে ভুল হয়েছে। কিন্তু পুলিশের এক সদস্য বাইকের পেছনে থাকা যুবককে ধাক্কা না দিলে এবং কনস্টেবল আলাউদ্দিন বাইকচালককে জাপটে না ধরলে ট্রাকের নিচে পড়ে তাকে পা হারাতে হতো না।

এ ছাড়া অভিযানের সময় ট্রাকটি আসছিল ধীর গতিতে। এতে চালক ও সহকারীর কী দোষ ছিল, সেটিও প্রশ্ন তাদের।

গত ২২ জুন ভোরে লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আলোচিত ওই দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভির একটি ফুটেজে দেখা যায়, মহাসড়কে অস্থায়ী চেকপোস্টে তল্লাশি করছেন পুলিশ সদস্যরা। একপর্যায়ে একটি ট্রাক চেকপোস্টের সামনে আসে। এর পেছনে ছিল একটি মোটরসাইকেল। এ সময় এক পুলিশ সদস্য সেটিকে থামার সংকেত দেন। কিন্তু সেটি ধীর গতিতে চলা ট্রাককে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন একজন পুলিশ সদস্য দৌড়ে সড়ক পার হয়ে সেটিকে আটকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ঠিক একই সময় ট্রাকের অন্য পাশে আরেকটি মোটরসাইকেল চেকপোস্ট অতিক্রম করতে থাকে। পুলিশ সদস্যরা থামার সংকেত দিলে সেটিও চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। ওই মোটরসাইকেলে দুজন ছিলেন। এ সময় এক পুলিশ সদস্য দৌড়ে গিয়ে বাইকের পেছনে বসা যুবককে ধাক্কা দিলে মোটরসাইকেল নিয়ে তারা রাস্তায় পড়ে যান। তখন কনস্টেবল আলাউদ্দিন পাশ থেকে দৌড়ে এসে মোটরসাইকেলের চালককে জাপটে ধরেন। এ সময় কনস্টেবল আলাউদ্দিনের এক পা ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে থেঁতলে যায়। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বর্তমানে আহত আলাউদ্দিন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা তার একটি পা গোড়ালি পর্যন্ত কেটে ফেলেছেন।

জানা গেছে, মোটরসাইকেল আরোহীকে ধাক্কা দেওয়া পুলিশ সদস্যের নাম মো. মনসুর। কনস্টেবল হিসেবে লোহাগাড়া থানায় কর্মরত তিনি। মোটরসাইকেল আরোহীকে মো. মনসুরের ধাক্কা দেওয়ার কারণ জানতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। গত সোমবার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) শেখ মো. সেলিমকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে লোহাগাড়া থানায় গিয়ে কনস্টেবল মনসুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্ত কমিটি।

এ বিষয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. তফিকুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কনস্টেবল মনসুরের গাফিলতির প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অন্যতম শীর্ষ এই কর্মকর্তার দাবি, মোটরসাইকেলে করে ইয়াবা পাচারের তথ্য পেয়ে আটকানোর জন্য লোহাগাড়া থানা-পুলিশ মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছিল। সেখানে একটি মোটরসাইকেলকে থামার সংকেত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি সংকেত অমান্য করে বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। একই গতিতে পেছনে আরেকটি মোটরসাইকেল আসছিল। সেটিও সংকেত অমান্য করে চলে যাওয়াার চেষ্টা করলে পুলিশ সদস্যরা আটকানোর চেষ্টা করেন। এরপরই ঘটনাটি ঘটে যায়।’

লোহাগাড়া থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, ‘যেহেতু এ ঘটনা নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, এ কারণে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’