জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বছর পূর্তি উদযাপনে সরকারের কার্যক্রম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে আগামী ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ দিনব্যাপী (মাঝে বিরতি দিয়ে) নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘জুলাই স্মৃতি উদযাপন অনুষ্ঠানমালা’। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানানো হয়।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। তার আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে পুরো জুলাই মাস ধরে আন্দোলন হয়। ছাত্র-জনতার এ অভ্যুত্থানকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব বলা হয়। এই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে ৩৬ দিনের অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা জানাল সরকার।

এর আগে গত ১৯ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘আমাদের এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য জুলাইয়ে যে রকম পুরো বাংলাদেশ এক হয়েছিল, আবার সে অনুভূতিটাকে ফিরিয়ে আনা।’

ঘোষিত অনুষ্ঠানমালা অনুযায়ী শুরুর দিন অর্থাৎ ১ জুলাই মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে শহীদের স্মরণে দোয়া ও প্রার্থনা করা হবে। একই দিনে জুলাই ক্যালেন্ডার দেওয়া হবে এবং জুলাই হত্যাকা-ের খুনিদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচির সূচনা করা হবে। এটি চলবে আগামী ১ আগস্ট পর্যন্ত। এদিন জুলাই শহীদ স্মরণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবৃত্তি চালু করা হবে।

অবশ্য প্রতিদিন এ অনুষ্ঠান হবে না। কয়েক দিন বিরতি দিয়ে দিয়ে এ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। যেমন ১ জুলাইয়ের পর ৫ জুলাই বিভিন্ন সময়ে অবৈধ আওয়ামী সরকারের জুলুম নির্যাতন প্রচারে দেশব্যাপী পোস্টারিং কর্মসূচি পালিত হবে। তারপর ৭ জুলাই ঔঁষুভড়ৎবাবৎ.ড়ৎম নামক একটি ওয়েবসাইট চালু, ১৪ জুলাই ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ শিরোনামে জুলাই নারী দিবস হিসেবে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ১৪ জুলাইয়ের ভিডিও শেয়ার, শহীদ পরিবারের সাক্ষ্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হবে এবং চলবে ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) পর্যন্ত। প্রত্যেক জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ৬৪টি জেলায় ও দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাইয়ের ভিডিও প্রদর্শন। টিএসসিতে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, প্রজেকশন ম্যাপিং ও জুলাইয়ের গান এবং ড্রোন শো অনুষ্ঠিত হবে।

১৫ জুলাই ‘আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া’ শিরোনামে অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে ১৫ জুলাইয়ের ভিডিও শেয়ার, জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী ও জুলাইয়ের গান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলইডি ওয়াল ইনস্টলেশন, প্রজেকশন ম্যাপিং, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন।

১৬ জুলাই অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘কথা ক’। এদিন ১৬ জুলাইয়ের ভিডিও শেয়ার, শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে তিনটি বিভাগীয় শহরে ‘ভিআর শো’ প্রদর্শন, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আবু সাঈদ স্মরণ অনুষ্ঠান, জুলাইয়ের গান এবং ড্রোন শো প্রদর্শন এবং চট্টগ্রামে জুলাইয়ের গান এবং ড্রোন শো প্রদর্শন করা হবে।

‘শিকল-পরা ছল’ শিরোনামে ১৭ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে ওইদিনের ভিডিও শেয়ার, প্রতীকী কফিন মিছিল, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই স্মরণ’ অনুষ্ঠান, বিভিন্ন প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের ১৭ জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা অনুষ্ঠান এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়ে ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী।

১৮ থেকে ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) পর্যন্ত টানা বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। একেক দিন একেক শিরোনামে অনুষ্ঠান উদযাপন করা হবে। এগুলো হলো ‘আওয়াজ উডা’, ‘কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা’, ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’, ‘রক্ত গরম মাথা ঠা-া’, ‘আভাস’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ ‘কী করেছে তোমার বাবা’, ‘চলো ভুলে যাই’, ‘পলাশীর প্রান্তর’, ‘বাংলা মা’, ‘চল চল চল’, ‘কা-ারি হুঁশিয়ার’, ‘গণজোয়ার’, ‘আমি বাংলায় গান গাই’, ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’, ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’।

অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে ভিডিও শেয়ার, ১ মিনিটের প্রতীকী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, জুলাইয়ের গান, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন ও ড্রোন শো, ঢাকার বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘জুলাই স্মরণ’ অনুষ্ঠান, ট্র্যাশন শো ও ম্যারাথন, শহীদদের স্মরণে সমাবেশ-১ নরসিংদী, সাভার, ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জুলাইয়ের তথ্যচিত্র প্রদর্শন, ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জুলাইয়ের তথ্যচিত্র প্রদর্শন। শহীদদের স্মরণে সমাবেশ-২ (স্থান-বসিলা, মিরপুর ১০), ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে জুলাইয়ের তথ্যচিত্র প্রদর্শন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের উদ্যোগে সব মাদ্রাসায় জুলাইয়ের স্মরণে অনুষ্ঠান, শহীদদের স্মরণে সমাবেশ-৩ (স্থান-যাত্রাবাড়ী)।

এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগরে ‘অদম্য-২৪’ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন, রাজু ভাস্কর্যের সামনে জুলাইয়ের কবিতা পাঠ, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সংযুক্ত করে অনুষ্ঠান, বৈশ্বিক সংহতি : জুলাই আন্দোলনে বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে যারা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের নিয়ে অনলাইন ও অফলাইন আয়োজন, দূতাবাসগুলোতে জুলাইয়ের কিছু নির্বাচিত ছবি ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন কর্মসূচি, শিশু শহীদদের স্মরণে দেশব্যাপী কর্মসূচি, দেশব্যাপী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ‘২৪-এর রঙে গ্রাফিতি ও চিত্রাঙ্কন’ প্রতিযোগিতা, নারায়ণগঞ্জে শিশু শহীদ রিয়া গোপের স্মরণে অনুষ্ঠান, শিশু শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠান, জুলাইয়ের তথ্যচিত্র প্রদর্শনী ও গান, শিশু একাডেমিতে জুলাইয়ের শিশু শহীদদের থিম করে একটি আইকনিক ভাস্কর্য স্থাপন, শিশুদের জন্য জুলাই আন্দোলনকে উপজীব্য করে গ্রাফিক নভেল প্রকাশ করা হবে।

অন্য অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট নাট্যমঞ্চ প্রস্তুত করে নাটক প্রদর্শনী, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের জমায়েত ও অনুষ্ঠান, মাদ্রাসার ভূমিকা নিয়ে তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, জুলাইয়ের র‌্যাপ গানের অনুষ্ঠান, বাংলা একাডেমিতে জুলাইয়ের প্রকাশিত বই নিয়ে বইমেলা, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ, কালচারাল প্যারাডাইম শিফট তথ্যচিত্র ও বুদ্ধপূর্ণিমা নিয়ে ভিডিও চিত্র প্রচার, জুলাইয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে অনুষ্ঠান, ‘চিকিৎসা নেই, লাশ নেই’ শীর্ষক তথ্যচিত্র প্রদর্শনী।

এ ছাড়া জুলাই স্মৃতি উদযাপন উপলক্ষে সারা দেশে রক্তদান ও মেডিকেল ক্যাম্পেইন, জুলাই অভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের সংস্কৃতিবিষয়ক বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, গাজীপুরে অথবা সাভারে শ্রমিকদের সমাবেশ, অনলাইনে জুলাই স্মরণ, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখা সাংবাদিকদের নিয়ে অনুষ্ঠান, দেশব্যাপী সব কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির স্মরণে অনুষ্ঠান, ৬৪টি জেলায় জুলাই নিয়ে বানানো তথ্যচিত্র প্রদর্শন, সব বাংলাদেশি দূতাবাসে জুলাই নিয়ে বানানো নির্বাচিত তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, ‘২৪ জুলাই ফটোগ্রাফারের চোখ দিয়ে’ কফি টেবিল বুক প্রকাশনা, জুলাই হত্যাযজ্ঞের খুনিদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালিত হবে।

বাংলাদেশের সব জেলার ‘জুলাইয়ের মায়েরা’ শীর্ষক বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রজেকশন ম্যাপিং, শাহবাগ থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত শোভাযাত্রা, রিকশায় জুলাইয়ের গ্রাফিতি অঙ্কন ও রিকশা মিছিল, ৬৪টি জেলায় জুলাই নিয়ে বানানো তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, সারা দেশে জুলাই যোদ্ধাদের সমাগম, জুলাইয়ের কার্টুনের প্রদর্শনী, ৬৪টি জেলায় ‘স্পটলাইট অন জুলাই হিরোজ’ শীর্ষক তথ্যচিত্র প্রদর্শনী স্থান পেয়েছে জুলাই স্মৃতি অনুষ্ঠানমালায়।

সবশেষ ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) ‘শোনো মহাজন’ শিরোনামে অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে ওইদিনের ভিডিও শেয়ার, ৬৪ জেলার কেন্দ্রে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শহীদ পরিবারের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ, শহীদদের জন্য প্রার্থনা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে বিজয় মিছিল, এয়ার শো, গানের অনুষ্ঠান, ‘জুলাইয়ের ৩৬ দিন’সহ জুলাইয়ের অন্যান্য ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, ড্রোন শো এবং র‌্যাপের সঙ্গে বচসা।