প্রচুর জমির মালিক হাসান তাহের

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান মাল্টি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হাসান তাহের ইমাম ভুয়া সফটওয়্যার খুলে বিনিয়োগকারীদের কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ওই টাকা দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি কিনেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে হাসান তাহের ও তার স্ত্রীর নামে দেশের ২৩টি স্থানে জমি কেনার তথ্য মিলেছে। এসব সম্পদের বাইরে তার আর কোথায় সম্পদ আছে ও তিনি কী পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন তার সন্ধান করছে সংস্থাটি।

দুদকের তথ্যমতে, মাল্টি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের প্রধান হাসান তাহের ইমামের বিরুদ্ধে তার ব্রোকার হাউজে শত শত বিনিয়োগকারীর কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নিজের ও স্ত্রী-সন্তানদের নামে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে সংস্থাটিতে। কমিশন ২০২৪ সালের মার্চ মাসে জমা হওয়া অভিযোগটির অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংস্থাটির সহকারী পরিচালক আফিয়া খাতুনকে নিয়োগ করে। তিনি সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে হাসান তাহের ইমাম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংক-বীমা, সিটি করপোরেশন, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেন। গত বছরের ৭ মে পাঠানো ওই নোটিস পেয়ে বিভিন্ন দপ্তর থেকে অভিযোগসংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র দুদকে পাঠানো হয়।

দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘হাসান তাহের মহাপ্রতারক। তার ব্রোকার হাউজে যারা বিনিয়োগ করেছেন তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি দুটি সফটওয়্যার ব্যবহার করতেন। যে সফটওয়্যার বিনিয়োগকারীরা দেখতেন সেটি ছিল ভুয়া। তিনি মূল সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের না জানিয়ে শেয়ার হাতবদল করতেন। তিনি বিনিয়োগকারীদের না জানিয়ে গোপনে শেয়ার স্থানান্তরের মাধ্যমে কোটি কোটি আত্মসাৎ করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অভিযোগটি দুদকে জমা হলেও প্রভাবশালীদের তদবিরের কারণে বেশিদূর এগোয়নি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর অনুসন্ধানে গতি ফিরে আসে; সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে দুদকে অভিযোগসংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পাঠানো শুরু হয়।

দুদকসূত্র বলেছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে হাসান তাহের ইমামের নামে ২০টি ও তার স্ত্রী সিলমাত চিশতীর নামে ৩টি স্থানে জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। হাসান তাহের ইমামের নামে রাজধানী বনানীর জি-ব্লকের ৭ নম্বর রোডে ১১ কাঠা ১২ ছটাক আয়তনের ২১ নম্বর এবং বনানী সি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডে ৭ কাঠা ১ ছটাক আয়তনের ৬৫ নম্বর প্লট রয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুরের টঙ্গী উপজেলার পালশোনা মৌজার কয়েকটি দাগে ১২ একর সাড়ে ২০ শতাংশ জমি, আরেক দাগে ৭৫ শতাংশ, দুই দাগে সাড়ে ২৮ শতাংশ, এক দাগে ৩৩ শতাংশ, আরেক দাগে ২৮ শতাংশ, দুই দাগে সাড়ে ২৯ শতাংশ, এক দাগে সাড়ে ৩৮ শতাংশ, এক দাগে ৩৮ শতাংশ, এক দাগে ৫ শতাংশ জমি রয়েছে। গাছায় মৌজায় দুটি দাগে ৩৫ শতাংশ, একটি দাগে ৩৯ শতাংশ, এক দাগে সাড়ে ১৮ শতাংশ, আরেক দাগে ৪২ শতাংশ, এক দাগে ৬৭ শতাংশ, আরেক দাগে ৯৩ শতাংশ, এক দাগে ১৩ শতাংশ এবং মুদি পাড়া মৌজায় একটি দাগে ৯১ দশমিক ৮৭৫ শতাংশ, এক দাগে ৩৫ শতাংশ জমি রয়েছে। এসব সম্পদের দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে ১৭ কোটি ৭০ লাখ ৭৭ হাজার ২৪১ টাকা।

তাহের ইমামের স্ত্রী সিলমাত চিশতীর নামে গাজীপুরের টঙ্গী উপজেলার পালশোনা মৌজার কয়েকটি দাগে ৩ একর ৯৫ শতাংশ জমি, গাছায় মৌজায় এক দাগে ২ একর ৭১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মুদিপাড়া মৌজায় নয়টি দাগে ১ একর ৫৭ শতাংশ জমি রয়েছে। এসব সম্পদের দলিলমূল্য ২০ কোটি ৪২ লাখ ২৩ হাজার ৩০ টাকা দেখানো হয়েছে।

জানা গেছে, হাসান তাহের ইমাম ও তার স্ত্রীর সম্পদের দলিলমূল্য ৩৮ কোটি ১৩ লাখ ১১ হাজার ২৭১ টাকা দেখানো হলেও বাজারমূল্য কয়েকশ কোটি টাকা। এ বিষয়ে রাজউকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, রাজধানীর বনানীর জি-ব্লকের ৭ নম্বর রোডে ১১ কাঠা ১২ ছটাক জমির মূল্য ৮ কোটি এবং ৭ কাঠা ১ ছটাক জমির মূল্য ৫ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কাঠা জমির মূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। বাস্তবে সেখানে প্রতি কাঠা জমির মূল্য ১০-১২ কোটি টাকা। এ হিসাবে দুটি প্লটে থাকা মোট ১৮ কাঠা ১৩ ছটাক জমির মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। গাজীপুরের তিনটি মৌজায় চালু রেট অনুযায়ী জমির মূল্য দেখানো হয়েছে। বাস্তবে জমির বাজারমূল্য কয়েকগুণ বেশি।

দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘হাসান তাহের ইমামের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার সম্পদ গোপনে বিক্রির চেষ্টা চলছে। এ কারণে আমাদের অনুসন্ধান কর্মকর্তা হাসান তাহের ইমাম ও তার স্ত্রীর নামে থাকা সম্পদ জব্দ করতে আদালতে আবেদন করেছেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২ জুন হাসান তাহের ইমাম ও তার স্ত্রীর সম্পদ জব্দের আদেশ দেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন। আদালতের আদেশে তাদের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।’

দুদকের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে হাসান তাহের ইমাম ও তার স্ত্রীর সম্পদ জব্দ করা হলেও অনুসন্ধান শেষ হয়নি। দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসান তাহের ইমাম ও তার পরিবারের নামে বনানীর ৪ নম্বর রোড ও ৭ নম্বর রোডের বাড়ি ছাড়াও উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর রোডে একটি বাড়ি রয়েছে। ঢাকার একটি আবাসিক প্রকল্পে তার বেশ কয়েকটি প্লট রয়েছে। এসব বাড়ি ও প্লটের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক।

অভিযোগে আরও বলা হয়, মাল্টি সিকিউরিটিজ ব্যবহার করে বিভিন্ন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির সম্মুখীন করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে হাসান তাহের ইমামের বিষয়ে তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাসান তাহের ইমামের পরিচালনায় মিউচ্যুয়াল ফান্ড সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাবলিক ফান্ডগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে তার নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেন করে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তিনি রেইস পরিচালিত পাবলিক ফান্ড ও এসভিপির সমগ্র বাণিজ্যিক ও আর্থিক কার্যক্রম তার ব্যক্তিগত তহবিলের সুবিধার্থে ব্যবহার করছেন ও অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জন করেছেন। তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ৫ বছরে রেইস ফান্ড ট্রেড অপারেশনে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের অনৈতিক ও আইনবিরুদ্ধ লেনদেন হয়েছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাবলিক ফান্ড ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।

জানা গেছে, হাসান তাহের ইমাম আমেরিকাপ্রবাসী। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি ২০০৯ সালে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসেন। দেশে এসে তিনি রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের একটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠন করেন এবং মানুষকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেন। তিনি বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা রিটার্ন পায়নি, বরং সর্বস্বান্ত হয়েছেন। গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে গেলে হাসান তাহের ইমাম গোপনে দেশ ছাড়েন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আছেন বলে দুদকের কাছে তথ্য রয়েছে।