১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কার্যকর হয়েছে যুদ্ধবিরতি। এই অস্থায়ী শান্তির মুহূর্তে একে ‘সবার জন্য বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আন্তর্জাতিক মহলে এখনো দ্বিধা রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চালানো বোমা হামলায় আদৌ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কতটা ধাক্কা খেয়েছে।
ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে এসে গতকাল বুধবার ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো—ফোরদো, নাতানজ ও ইস্পাহান—পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “সব কিছু গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”
তবে ট্রাম্পের এমন ঘোষণার সঙ্গে মেলেনি মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ)-এর মূল্যায়ন। প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক ধারণা, হামলার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক মাসের জন্য ধীর হয়ে পড়লেও তা পুরোপুরি থেমে যায়নি। নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন ও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ ও সেন্ট্রিফিউজের বড় একটি অংশ অক্ষত রয়েছে। এমনকি হামলার আগেই ইরান কৌশলগতভাবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে বলেও উঠে এসেছে সূত্রের বরাতে।
এমন বাস্তবতায় ট্রাম্পের বক্তব্যকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক বিবৃতি’ বলে মনে করছেন, যেখানে সামরিক তথ্যের চেয়ে কূটনৈতিক অবস্থানই প্রাধান্য পেয়েছে।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে চালানো পরমাণু হামলার প্রসঙ্গ টানেন। যদিও সরাসরি তুলনা এড়িয়ে তিনি বলেন, “আমি হিরোশিমার উদাহরণ দিতে চাই না, নাগাসাকির উদাহরণও দিতে চাই না। তবে ঘটনাটা অনেকটা তেমনই ছিল।” তাঁর মতে, তীব্র সেই হামলাই যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা—যেখানে তিনি নিজের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলকে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। বাস্তবতা হলো, ইরান এখনো তার পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে এবং ভবিষ্যতে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করার আশঙ্কা রয়েই গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এই যুদ্ধবিরতি আপাতত শান্তির আশ্বাস দিলেও আঞ্চলিক উত্তেজনা একেবারে শেষ হয়ে গেছে বলা যায় না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, সত্যিকারের বিজয় তখনই হবে, যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কূটনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এখনকার এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি বিরতি—শেষ অধ্যায় নয়।