মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান গুণগুলোর একটি হলো সহনশীলতা। এই গুণটি সামাজিক ও পারস্পরিক সম্পর্ককে করে সুশৃঙ্খল, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও মানবিক। সহনশীলতা এমন এক মানসিক অবস্থান, যেখানে ব্যক্তি উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সংযত থাকে, অপ্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শান্ত ও মার্জিত আচরণ প্রদর্শন করে। নবীজি (সা.) ছিলেন সবচেয়ে সহনশীল মানুষ। তার সহনশীলতায় আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।
আজকের সমাজে মানুষের মধ্যে সহনশীলতার অভাব যে কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে, তা চারপাশের বাস্তবতা দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। সাধারণ পথঘাট থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, যানবাহন, দোকানপাট এমনকি পারিবারিক পরিবেশেও কথায় কথায় উত্তেজিত হয়ে পড়া, কটু কথা বলা, গালাগালি, এমনকি হিংসাত্মক আচরণে লিপ্ত হওয়া এখন একটি সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মানুষ যদি একটু ধৈর্য ধরত, সংযম অবলম্বন করত, তাহলে অনেক বড় ধরনের ঝামেলা, কলহ-বিবাদ এমনকি সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হতো।
সহনশীলতা ইসলামের মৌলিক নৈতিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম মানুষকে শুধু ধৈর্য ধরতে বলেনি, বরং সহনশীলতার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দীক্ষা দিয়েছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবনে সহনশীলতার এমন উদাহরণ রেখে গেছেন, যা শুধু মুসলমানদের নয়, বরং বিশ্বমানবতার জন্য এক অনন্য আদর্শ। তার জীবনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কীভাবে নিজের ওপর অত্যাচার সহ্য করেও মানুষের প্রতি করুণাশীল থেকেছেন, ক্ষমার হাত প্রসারিত করেছেন এবং হিংসার বদলে শান্তি, উত্তেজনার বদলে সংযমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তার সেই সহনশীলতা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং ইসলামি নৈতিকতার স্তম্ভ। তাই আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয় স্তরেও এই গুণটির চর্চা করা অপরিহার্য। সহনশীলতা যত বাড়বে, সমাজে তত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, এটাই ইসলামের শিক্ষা, নবী করিম (সা.)-এর আদর্শ এবং এক পরিপূর্ণ মানবিক সমাজের ভিত্তি। তিনি আমাদের জন্য উত্তম জীবনাদর্শ। তার জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ আমাদের জন্য আবশ্যিকভাবে অনুসরণীয়, অনুকরণীয়। তার প্রতিটি সুন্নাহ আমাদের জন্য আবশ্যিকভাবে পালনীয়। তা ছাড়া দুনিয়া ও আখেরাতে আমাদের মুক্তি নেই। তার জীবন, কর্ম ও আদর্শে সহনশীলতার যে মহান শিক্ষা রয়েছে তা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্যই এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাকে ঘোষণাই করা হয়েছে সমগ্র সৃষ্টির জন্য করুণার প্রতীক হিসেবে। জগৎবাসীর জন্য তার আবির্ভাবই হয়েছে আশীর্বাদ হিসেবে। তিনি সৃষ্টির প্রতি কতটা সহনশীল, এ থেকেই তা অনুমেয়। তার কীর্তিময় জীবনের বাঁকে বাঁকে অজস্র ঘটনা রয়েছে, যে সবের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তাকে বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ ও সৃষ্ট জীবের প্রতি অতিশয় সহনশীল হিসেবে দেখতে পাই।
অমুসলিম মেহমানের সেবা, আগত মেহমান কর্র্তৃক অসদাচরণ করার পরও তার প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠা, মদিনার মসজিদে প্রস্রাব করে দেওয়ার পরও অমুসলিম ব্যক্তির প্রতি তার সহনশীলতা প্রদর্শন, মক্কা বিজয়ের পর অমুসলিম নাগরিকদের বিষয়ে সাধারণ ক্ষমার নির্দেশনা, তায়েফের ঘটনায় পাথর-বৃষ্টিতে রক্তাক্ত হওয়ার পরও তাদের জন্য প্রার্থনা, অত্যাচারী মানুষদের ধ্বংস করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েও তাদের প্রতি রহমশীল হওয়া, শিরñেদ করতে আসা ব্যক্তিকেও প্রাণভিক্ষা দেওয়া, প্রিয় চাচা হামজার কলিজা চিবিয়ে খাওয়া বর্বর হিন্দাকেও ক্ষমা করে দেওয়া, বিষপ্রয়োগে হত্যা করতে চাওয়া ব্যক্তির প্রতি উদারতা প্রদর্শন ইত্যাদি অসংখ্য ঘটনায় তিনি যে সহনশীলতার অবিশ্বাস্য নজির স্থাপন করেছেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তা বিরল।
ইসলাম মানুষকে সহনশীল হতে এবং অন্যকে ক্ষমা করতে শেখায়। যারা কথায় ও কাজে সহনশীলতা প্রকাশ করে, মহান আল্লাহ তাদের জন্য রেখেছেন অনেক বড় পুরস্কার ও প্রতিদান। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই সহনশীলদের প্রতিদান পূর্ণভাবে দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার ১০)
মানুষের জীবন বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হয়। কখনো সুখের সম্মুখীন হয়, কখনো দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হয়, কখনো ভালো কাজের সঙ্গে জড়িত হয়, কখনো পাপে নিমজ্জিত হয়। এসব অবস্থায় মানুষকে চরম সংযম ও সহনশীলতা অবলম্বনের জন্য ইসলাম জোরালো তাগিদ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা সহনশীলতা ও নামাজের মাধ্যমে আমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয় আল্লাহ সহনশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ১৫৩)
সংযম ও সহনশীলতা জান্নাতের পথকে সুগম করে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সুখ-দুঃখে, বিপদ-আপদে, সংঘাত-সংঘর্ষে, দ্বন্দ্ব-কলহে, ঝগড়া-ফ্যাসাদে সর্বাবস্থায় সংযম ও সহনশীলতা অবলম্বন করা উচিত। সহনশীলতা ও ক্ষমা মুসলমানের ইমানের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। হজরত রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইমান কী? তিনি বলেন, ‘ইমান হচ্ছে ধৈর্য ও সহনশীলতা।’
যদিও সব সময় সংযত হওয়া কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ, তবু এটি এমন এক মহৎ মানবিক গুণ, যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণের জন্য খুবই প্রয়োজন। দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহনশীলতা ও সংযমের বিকল্প নেই। এ জন্যই ইসলাম ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়সহ সব ক্ষেত্রে সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোনের মধ্যে সহনশীলতা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতামত ও চিন্তার ক্ষেত্রে সহনশীলতা, অন্যান্য ধর্মের মানুষের আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক, সংলাপ ও সহযোগিতার মধ্যে সহনশীলতার দীক্ষা দেয়।
সহনশীলতা ইসলামের একটি মৌলিক নীতি এবং ধর্মীয় নৈতিক কর্তব্য। এর মানে এই নয় যে, ইসলাম কোনো অন্যায়ের ব্যাপারে ছাড় দেয়। ইসলাম সবসময়ই সহনশীলতার নির্দেশ দেয়। তবে অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দেয় না। বরং এমন সময় সহনশীলতার প্রাচীর ভেঙে প্রতিবাদী হতে বলে। সুতরাং সবার করণীয় হলো, দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হতে সহনশীলতার চর্চা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহনশীল হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।