থানা থেকে লুটের অস্ত্রে খুন-ডাকাতি-ছিনতাই

চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ অভিযানেও ধরা পড়ছে অপরাধী। উদ্ধার হচ্ছে থানা থেকে লুটের অস্ত্র ও গোলাবারুদ। গত বছরের ১৪ আগস্ট থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১০ মাসে অন্তত এক ডজন অভিযানে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে বেশিরভাগই বিদেশি পিস্তল ও রিভলবার।

সবশেষ বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে নগরের পাহাড়তলী এলাকা থেকে একটি বিদেশি রিভলবার ও ছয়টি গুলিসহ মো. মিনহাজ উদ্দিন (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবুল আজাদ জানান, গ্রেপ্তার মিনহাজ পেশাদার অপরাধী। গত বছরের ৫ আগস্ট পাহাড়তলী থানা থেকে লুট করা অস্ত্র দিয়েই মিনহাজ নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই ও লুটপাট করে আসছিল। তার বিরুদ্ধে পাহাড়তলী থানায় ১১টি মামলা আছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানায়, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নগরের ৮টি থানা ও ৮টি ফাঁড়িতে লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। ওই সময় ৮১৩টি অস্ত্র ও ৪৪ হাজার ৩২৪ রাউন্ড গুলি লুট হয়। তবে এসব অস্ত্র ও গুলির বেশির ভাগই এখনো উদ্ধার হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত ২৮ মে নগরের পাহাড়তলী থানা এলাকা থেকে মো. পারভেজ (২৫) ও রিয়াজুর রহমান (২২) নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দুজনের কাছ থেকে ধারালো দেশি অস্ত্রসহ একটি রিভলবার ও গুলি উদ্ধার করা হয়। রিভলবার ও গুলি গত বছরের ৫ আগস্ট পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হয় বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, উক্ত দুই ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র দিয়ে তারা পাহাড়তলী টোল সড়কে বিমানবন্দর ও পতেঙ্গাগামী যাত্রীদের ছিনতাই করত। এছাড়া অস্ত্র দিয়ে তারা আশপাশের মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে লুটপাট করত।  

এর আগে গত ১৭ এপ্রিল ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নগরের ডবলমুরিং থানার বারিক বিল্ডিং মোড় এলাকা থেকে আরিফ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার করে নগরের পুলিশ। পরে তার আস্তানা থেকে ইতালির তৈরি একটি ৭.৬৫ এমএম পিস্তল ও ৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

নগরের ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক আহমেদ বলেন, ‘গ্রেপ্তার আরিফ ডাকাত দলের নেতা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ স্বীকার করেছে তার কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র-গুলি ডবলমুরিং থানা থেকে লুট করেছিল। আরিফ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ডাকাতি, ছিনতাই করত। তার বিরুদ্ধে ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজির অভিযোগে নগরের বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। 

চলতি বছরের ২০ মার্চ নগরের পতেঙ্গা থানার কাঠগড় ও বাকলিয়া এলাকা থেকে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র বেচাকেনায় জড়িত অভিযোগে মো. রিয়াদ নামের এক পুলিশ কনস্টেবলসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকিরা হলো আবদুল গণি, আবু বক্কর, ফরহাদ  হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান ও মো. ইসহাক। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। কনস্টেবল রিয়াদ চাঁদপুর জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়।  গ্রেপ্তারের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র পুলিশের। চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানা থেকে এগুলো গত আগস্টে লুট হয়েছিল। বিস্তারিত তদন্তে বের করা হবে।’

চলতি বছরের ৬ মার্চ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে দুজনের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ যে পিস্তলটি উদ্ধার করেছিল, সেটি নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া। হত্যার আগে ওই পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়েছিল নিহত ব্যক্তিদের একজন নেজাম উদ্দিন। সাতকানিয়ার ঘটনাস্থল থেকে সেদিন উদ্ধার করা অস্ত্রটি নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট করা হয়েছিল বলে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) সাইফুল ইসলাম। 

গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর নগরের পাহাড়তলী থানার সাগরিকা এলাকায় ঝোপের মধ্যে পাওয়া যায় দুটি বিদেশি রিভলবার। এ সময় উদ্ধার করা হয় ১৬ রাউন্ড বুলেট। পরে পুলিশের তরফ থেকে জানা যায়, এসব অস্ত্র ও বুলেট থানা থেকে লুট হয়েছিল।

এর আগে ৩০  সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় সড়কের পাশে ঝোপের মধ্যে পড়ে থাকা বস্তা থেকে ৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও তিনটি গুলি উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৭। র‌্যাব জানায়, উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলি চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন থানা থেকে লুট হয়েছিল। একই বছরের ১৪ আগস্ট গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৭৫টি গোলাবারুদ উদ্ধারের কথা জানায় র‌্যাব-৭। ৩৫টি অস্ত্রের মধ্যে এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, রাইফেল, শটগান, পিস্তল ও গ্যাসগান রয়েছে।

সাধারণ মানুষ বা অপরাধীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র থাকা কতটা বিপজ্জনক জানতে চাইলে নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র যে কারও কাছে থাকাই বিপজ্জনক। কারও কাছে অস্ত্র থাকলে তার মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম কাজ করে। এতে মানুষের শরীর ও জানমালের ঝুঁকি থেকে যায়।’

নগর পুলিশের মিডিয়া অফিসার এডিসি মাহমুদা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু থানা থেকে লুটের অস্ত্র নয়, অপরাধীদের কাছ থেকে সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে নগর পুলিশ। অস্ত্র উদ্ধারে সাফল্যও ধরা দিচ্ছে।’ তবে গত ১০ মাসে অস্ত্র উদ্ধারের পরিসংখ্যান জানাতে পারেননি তিনি। এ প্রসঙ্গে একাধিকবার কল করলেও সাড়া দেননি সিএমপির উপকমিশনার (অপরাধ) রইছ উদ্দিন।