মনোনয়ন দৌড়ে বিএনপিতে বিভক্তি!

লন্ডনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর দলটির নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা ও গণসংযোগে সক্রিয় হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা ও আখাউড়া) আসনে দলীয় মনোনয়নের দৌড়ে অন্তত অর্ধডজন নেতা প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। এ প্রতিযোগিতা দলটির মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীদের কেউ কেউ।

কসবা ও আখাউড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বর্তমানে আওয়ামী লীগের আধিপত্য না থাকায় বিএনপির প্রার্থীরা তুলনামূলক নির্ভীকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখনো মাঠে সক্রিয় না হলেও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ইতিমধ্যে জোর প্রচারণা শুরু করেছেন।

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান এবারও এ আসনে দলীয় মনোনয়নের জন্য অন্যতম প্রত্যাশী। বয়সের কারণে শারীরিকভাবে কিছুটা সীমাবদ্ধ হলেও তিনি এখনো নেতাকর্মী ও ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। তার সমর্থকরা ইতিমধ্যে প্রচারণা শুরু করেছেন।

মনোনয়নের দৌড়ে রয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সদস্য প্রকৌশলী নাজমুল হুদা খন্দকার। তিনি প্রথমবারের মতো মনোনয়নপ্রত্যাশী। তার সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক কার্যক্রম তাকে ভোটের মাঠে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। তরুণ ভোটার ও নেতাকর্মীদের মধ্যে তার ‘ক্লিন ইমেজ’ এবং তৎপরতা উৎসাহ সৃষ্টি করেছে।

এ ছাড়া লন্ডনপ্রবাসী ব্যবসায়ী ও জেলা বিএনপির সদস্য কবির আহমেদ ভূঁইয়াও প্রথমবারের মতো মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন এবং নেতাকর্মীদের পাশে থাকার কারণে তিনিও আলোচনায় রয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় আরও রয়েছেন বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন হাজারী ও প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন। তবে মুশফিকুর রহমান, নাজমুল হুদা খন্দকার এবং কবির আহমেদ ভূঁইয়ার চারপাশেই মূলত ভোটের হিসাব-নিকাশ ঘুরছে।

কসবা ও আখাউড়া উপজেলায় বিএনপির মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। মুশফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি অংশ এবং কবির আহমেদ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আরেকটি অংশ সক্রিয়। মুশফিকুর রহমানের সমর্থকরা ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করলেও কবির আহমেদ ভূঁইয়া আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

এই বিভক্তি গত বছরের ১১ ডিসেম্বর আখাউড়া স্থলবন্দরে লং মার্চ ও সমাবেশের সময় আরও প্রকট হয়। ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে হামলা, জাতীয় পতাকার অবমাননা ও ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচারের প্রতিবাদে আয়োজিত এ কর্মসূচির স্থানীয় তত্ত্বাবধানে ছিলেন কবির আহমেদ ভূঁইয়া। মুশফিকুর রহমানের অনুসারীরা এ কর্মসূচি বয়কট করেন, যা দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তিকে আরও স্পষ্ট করে।

কসবা পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘মুশফিকুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ। তবে নাজমুল হুদা খন্দকারও ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনি দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন এবং সামাজিক কার্যক্রমে অবদান রেখেছেন। আমরা মনে করি, তিনি ভোটের মাঠে সুবিধা পাবেন। তবে দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই আমরা মেনে চলব।’

আখাউড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন আব্দু বলেন, ‘কবির আহমেদ ভূঁইয়া দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। আমরা আশা করি, দল তাকেই মনোনয়ন দেবে। তবে হাইকমান্ডের নির্দেশ মেনেই আমরা কাজ করব।’

প্রকৌশলী নাজমুল হুদা খন্দকার বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাই। কসবা-আখাউড়ার মানুষ আমাকে গ্রহণ করছে। আমি নীরবে কাজ করে গেছি এবং আশা করি, দল আমার অবদানের মূল্যায়ন করবে।’

কবির আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে আমি মাঠে ছিলাম। কসবা-আখাউড়ার নেতাকর্মীরা আমার অবদান সম্পর্কে জানেন। আমার কাজই আমাকে কাক্সিক্ষত অবস্থানে নিয়ে যাবে।’