চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের দেওয়া যাবে না। একইসঙ্গে বেসরকারিকরণও করা যাবে না। সক্ষমতা বাড়িয়ে বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করতে হবে চট্টগ্রাম বন্দরকে। করিডরও দেওয়া যাবে না। বন্দর ও করিডর ইস্যুতে ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণের’ রোড মার্চ গতকাল শনিবার বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে এসে পৌঁছায়।
বামপন্থি বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত এ প্ল্যাটফর্মের নেতারা দাবি করেন, বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির ৯২ ভাগ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি প্রধানত চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নিভর্রশীল। বন্দরের মতো কৌশলগত সম্পদ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক লাভ দিয়ে বিচার করা যায়না, দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক-সামরিক নিরাপত্তা, ঝুঁকি ইত্যাদি অনেকগুলো স্পর্শকাতর বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে যেখানে আমাদের একটিমাত্র প্রধান বন্দর এবং এর বাইরে মাত্র ৩টা অগুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর আছে, সেখানে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে এর কোনো অংশ লিজ দেওয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের কৌশলগত সম্পদ চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা জাতীয় স্বার্থবিরোধী এবং তা ঠেকাতে দেশের জনগণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রোড মার্চে অংশ নেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজসহ অর্ধশতাধিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী। রোড মার্চের অংশ হিসেবে শুক্রবার ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে সোনারগাঁও, কুমিল্লা ও ফেনীতে একাধিক পথসভা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দিন গতকাল সকালে ফেনী থেকে শুরু হয়ে মীরসরাই ও সীতাকু-ে পথসভা শেষে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে রোড মার্চ। শেষে বন্দর ভবনের সামনে গিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।
সংগঠনটি স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা চালুর উদ্যোগকে ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধচক্রে’ বাংলাদেশকে জড়ানোর চেষ্টার অংশ বলেও অভিহিত করে। ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’ জানায়, এই আন্দোলন শুধু একটি বন্দর বা প্রকল্পের বিরুদ্ধে নয়, বরং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা রক্ষার একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াই।
এর আগে গতকাল সকালে ফেনীতে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স) রোডমার্চ কর্মসূচির চার দফা দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো নিউমুরিংসহ চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে দেওয়া চলবে না, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পরিচালনা করতে হবে, রাখাইনে করিডর দেওয়ার ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে; স্টারলিংক, সমরাস্ত্র কারখানা, করিডরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধচক্রে জড়ানোর উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে, মার্কিন-ভারতসহ ‘সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী দেশগুলোর’ সঙ্গে বিগত সব সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত সব চুক্তি প্রকাশ করতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী অসম চুক্তি বাতিল করতে হবে।
ফেনীতে রুহিন হোসেন বলেন, আমরা মনে করি, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা হলো গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা, আধিপত্যবাদ আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আকাক্সক্ষা। গণঅভ্যুত্থানকে কোনোভাবে বিতর্কিত করা যাবে না। পাহাড়িদের ওপর নির্যাতন করা যাবে না, দেশে কোনোভাবে বৈষম্য তৈরি করা যাবে না, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। ইতিপূর্বে বিভিন্ন আন্দোলনে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া সব শহীদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এ আন্দোলন দীর্ঘদিনের।
চট্টগ্রাম বন্দর প্রসঙ্গে রুহিন হোসেন আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, হৃৎপি-। আমরা আশা করব, বিগত সরকারের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার বন্দর ইজারা দেওয়াসহ যে কাজ করতে চাইছে, তা থেকে তারা পিছু হটবে। আর এটা নিয়ে আমাদের আজকের রোডমার্চ শেষে আর কোনো বৃহত্তর কর্মসূচি দিতে হবে না। কিন্তু যদি সরকার এই দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে সমাপনী সমাবেশ থেকে আমরা ঘোষণা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের বৃহত্তর কর্মসূচি দেব।
নেতৃবৃন্দ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অবিলম্বে দেশের স্বার্থবিরোধী এসব তৎপরতা বন্ধ না করলে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে এবং কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।