আগামী সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হবে না এ রকম কোনো লক্ষণ আমি দেখছি না। শুধু শুধু এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দরকার নেই। আমি দেখছি নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হচ্ছে। সারা দেশ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো, এমনকি নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন শুধু যে কাজটা হয়নি, সেটিকে অজুহাত করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অনুচিত। কোনো কিছুতেই শতভাগ ঐকমত্য থাকে না, রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্বিমত থাকবেই। এটিই গণতান্ত্রিক বাস্তবতা। সবাইকে তার মত প্রকাশের অধিকার দেওয়া উচিত।’
গতকাল রবিবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনারের সৌজন্য বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। গত শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ইসলামী দলগুলোর ‘আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন’ দাবির প্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে খসরু এ কথা বলেন।
প্রায় ঘণ্টাব্যাপী কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির নেতৃত্ব দেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সঙ্গে আমীর খসরু ছাড়াও ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে খসরু বলেন, ‘শুধু একটি জায়গায় নয়, সারা দেশেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। অনেক কিছু রিপোর্টই হচ্ছে না। সরকারকে আরও সক্ষম হতে হবে, নজরদারি বাড়াতে হবে। এ ধরনের ঘটনার রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে। একটি মহল এসব ঘটনার মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে চায় এবং নির্বাচনীভাবে ফায়দা লুটতে চায়, কিন্তু এতে তারা সফল হবে না।’
খসরু বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনা সবাই জানে। বিভিন্ন মিডিয়াতে এসেছে যে এটি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কেউ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও এটা ছড়িয়েছে।’
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্নে আমীর খসরু বলেন, ‘প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্যই থাকতে হবে, তবে সেটি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থরক্ষার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যেন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপমুক্ত হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। এ শর্তগুলো নিশ্চিত করতে পারলে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।’ তিনি আরও জানান, ‘অনেক বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী কানাডায় পড়াশোনা করে। তাদের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক সংযোগ গড়ে তোলা যায়। কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির অগ্রগতিতে কানাডা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, সেসব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’
এদিকে রবিবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ক্ষমতায় আসলে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ১ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত বিএনপির কর্মসূচি থাকবে। ভোট, নির্বাচন এবং ক্ষমতায় আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না জুলাই গণঅভ্যুত্থান। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আয়োজনে অংশ নেবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (আজ) ৩০ জুন মধ্যরাতে শহীদ মিনারে ছাত্রদল ফুল দেবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সরকার, জনগণকে স্থিতিশীল রাখতে দিতে চায়না পতিত স্বৈরাচারী সরকার। আওয়ামী লীগের এক নেতা কুমিল্লায় ধর্ষণ করে বিএনপির ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ করে এমন ঘটনা ঘটছে না, ওরা একটা নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করছে। সরকারের উচিত ছিল এদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা। সরকারের ধীর পদক্ষেপের কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। মুরাদনগরে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’
নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে একটি গোষ্ঠী জাতির সর্বনাশ করতে চাচ্ছে : মির্জা আব্বাস
একটি গোষ্ঠী নির্বাচনকে পিছিয়ে দিয়ে জাতির সর্বনাশ করতে চাচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তিনি বলেছেন, ‘একেকজন একেকটা দাবি তুলে নির্বাচনকে পিছিয়ে, নির্বাচনী ব্যবস্থার সর্বনাশ করে দিয়ে এ জাতির বিনাশ ঘটাতে চাচ্ছে।’
গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির রমনা শাখার উদ্যোগে দলের সদস্য নবায়ন ও প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ অভিযান উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আব্বাস এ কথা বলেন।
আব্বাস বলেন, ‘এভাবে বড় বড় সমাবেশ করে জাতির কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাবেন না। সমাবেশ দিয়ে যদি প্রমাণ করা যায় কে কত জনপ্রিয়, আমরা সারা বাংলাদেশকে একদিনে সমাবেশের আওতায় আনতে পারি। সারা বাংলাদেশ একদিনে সমাবেশ করবে। কেউ কোনো জায়গা ছাড়বে না। কিন্তু এটা তো সিস্টেম হলো না। সবাইকে অনুরোধ জানাব, আউল-ফাউল কথাবার্তা বইলেন না কেউ। আপনারা এই সমস্ত কথাবার্তা বলে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করবেন না।’
ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করীমকে উদ্দেশ করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘যখন বিএনপি-জামায়াতের ওপরে স্টিমরোলার চালানো হচ্ছিল, তখন ওই দলটি এবং তার নেতা দূরে থেকে বাহবা দিয়েছেন। ইনডাইরেক্টলি হাসিনাকে সমর্থন দিয়েছেন। কালো নির্বাচন, রাতের নির্বাচন, দিনের নির্বাচন; তিনবার নির্বাচন হয়েছে, উনারা কোনো প্রতিবাদ করেননি। এখন লম্বা কথা বলতেছেন, আগে দিতে হবে স্থানীয় নির্বাচন, এরপর দিতে হবে পিআর সিস্টেম (আনুপাতিক পদ্ধতি)। যত দিন এগুলো না হবে, তত দিন এ দেশে কোনো নির্বাচন হবে না।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘পিআর পদ্ধতি কই থেকে আসে। দেশটাকে সুন্দর করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কিছু করেন না, শুধু আপনার কথামতোই হতে হবে, স্থানীয় সরকার আগে হতে হবে, আবার পিআর ভোট করতে হবে। কেন ভাই? কই থেকে আবিষ্কার করেন এগুলা? কে দেয় বুদ্ধি আপনাদের? এসব কুপরামর্শ নিয়ে, এই দেশ ও জাতিকে ধ্বংস করার জন্য একদল লোক আজ মাঠে নেমেছে।’
ইরানের উদাহরণ টেনে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমাদের মুসলিম বিশ্বের কেউ যখন তাকে সমর্থন দিল না, ইরান একাই যুদ্ধ করে গেল। কারণ জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল। আর আমার দেশের মধ্যে কিছু রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, কিছু রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় যেতে দেব না, এই করে করে দেশটাকে গত ৫০ বছরে এগোতে দিল না। দেশটাকে আমরা ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছি।’ দেশকে ভালোবেসে সবাইকে এক জায়গায় আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা দেশকে ভালোবাসেন, একটা জায়গায় আসেন। যে জায়গায় গেলে পরে দেশ ও দেশের মানুষের উন্নতি হবে।’
মির্জা আব্বাস বলেন, ‘গত পরশু দিন রাতে ৫ দিনের চীন সফর শেষে দেশে ফিরেছি। ৫দিন বাইরে থাকা মানে আমার কাছে অনেক সময় মনে হয়েছে। আজ পত্রিকাটা পড়ে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল, নিজের দল তো আফটারঅল। আমার মা যদি ছিন্ন ড্রেসে থাকেন, খারাপ অবস্থায় থাকেন তারপরেও আমার মা। তাকে তো ফেলে দিতে পারব না। সেখানে একটা জায়গায় গিয়ে একজনকে জিজ্ঞাসা করছিলাম, তোমাদের এখানে মারামারি ধরাধরি হয় না। বলল, মারামারি তো কিছু একটা হয়। তারপরে কী হয়? থানা পুলিশ? ওরা পুলিশ চেনেই না। বলল, পিসম্যান আছে। একেকটা এলাকায়, একেকটা ওয়ার্ডে একেকজন পিসম্যান। অর্থাৎ উনি শান্তিরক্ষা করেন। বুঝতে পারছেন অবস্থাটা। আর আমাদের এখানে অবস্থাটা কী?’
তিনি বলেন, ‘আজ এই অঞ্চলে সদস্য সংগ্রহ অভিযান। এখানে খেয়াল রাখবেন, কাদের আপনারা সদস্য করছেন। খারাপ লোক, আওয়ামী দোসর, চাঁদাবাজদের সদস্য করা যাবে না। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য মো. শরীফ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আবদুস সালাম আজাদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। নতুন সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রমের সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মকবুল হোসেন সরদার।