অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট গ্রহণ করে সাড়ে ৭ বছর আগে দেওয়া আদেশ স্থগিত করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ গতকাল রবিবার এ আদেশ দেয়। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর বিচার বিভাগ পৃথককরণ-সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায়ে ১২ দফা নির্দেশনা দেয় আপিল বিভাগ। এ রায়ের ভিত্তিতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নে নির্দেশনা ছিল। ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর এ-সংক্রান্ত গেজেট জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বে গঠিত আপিল বেঞ্চ এই গেজেট গ্রহণ করে আদেশ দেয়। এ আদেশ পুনর্বিবেচনা চেয়ে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরসহ আট আইনজীবী গত মাসে একটি রিভিউ (আদেশ পুনর্বিবেচনা) আবেদন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিষয়টি শুনানিতে আসে। গত বৃহস্পতিবার শুনানি নিয়ে আদেশের জন্য রবিবার (গতকাল) দিন ধার্য করে আপিল বিভাগ।
আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। পরে অ্যাডভোকেট শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, তৎকালীন সরকার (আওয়ামী লীগ) আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর খবরদারি করার জন্য এই শৃঙ্খলাবিধি রাখতে চেয়েছিল। শৃঙ্খলাবিধির গেজেট গ্রহণ করে যে আদেশ হয়েছিল, সেটি স্থগিত করা হয়েছে। এখন ওই আদেশের আর কোনো কার্যকারিতা থাকল না। শৃঙ্খলাবিধি বর্তমানে যা আছে, তা অন্তর্র্বর্তী সময়ের জন্য কার্যকর থাকবে। বিচার বিভাগ পৃথক সচিবালয়-সংক্রান্ত ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে হাইকোর্টে রুলের শুনানি বিচারাধীন।
এ বিষয়ে শিশির মনির বলেন, এই শুনানি যথাযথভাবে চলবে। গেজেট গ্রহণের আদেশ স্থগিত হওয়ায় অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ১১৬ অনুচ্ছেদবিষয়ক হাইকোর্টে চলমান রুল শুনানি ও নিষ্পত্তিতে আর কোনো বাধা রইল না। তিনি জানান, গেজেট গ্রহণের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।
যেভাবে সূত্রপাত : ১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড একধাপ নামিয়ে দেওয়ার পর তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ এবং জুডিশিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের তখনকার মহাসচিব মাসদার হোসেনসহ ২১৮ জন বিচারক হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। ১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করে। একই সঙ্গে বিচারকদের বিসিএস ক্যাডারভুক্ত করার বৈধতা প্রশ্নে রুল দেয় আদালত। ১৯৯৭ সালের ৭ মে রুল মঞ্জুর করে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস করতে রায় দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথককরণে রায় দেয়। বিচারিক হাকিমদের নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করা হবে আর নির্বাহী বিভাগের হাকিমরা বিচারিক কাজ করতে পারবেন না। রায় ও নির্দেশনায় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে আপিল বিভাগ। এ ছাড়া দ্রুত জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত করা, বিচার বিভাগকে স্বাধীন করে নির্বাহী বিভাগের অধীনে না রাখার নির্দেশনা দেয় আদালত।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের নভেম্বরে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হলেও বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির বিষয়টি অনিষ্পন্ন থেকে যায়। ২০১৮ সালের শুরুতে এ গেজেট প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতপার্থক্য তৈরি হয়। শৃঙ্খলাবিধি নিয়ে আপত্তি তোলেন তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। এর আগে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ-সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে টানাপড়েনের জেরে তিনি দেশত্যাগ করেন এবং বিদেশ থেকেই প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন বিচারপতি এস কে সিনহা।