দেশে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছয়টি প্রধান অসংক্রামক রোগ চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। এগুলো হলো ব্রংকিয়াল অ্যাজমা, জন্মগত হৃদরোগ, মৃগীরোগ (এপিলেপসি), থ্যালাসেমিয়া, কিডনি রোগ এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিস।
এসব রোগের মধ্যে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ব্রংকিয়াল অ্যাজমায় ৩৭ শতাংশ শিশু। এরপর থ্যালাসেমিয়া ও আয়রন ডেফিশিয়েন্সি অ্যানিমিয়াতে ২৮ শতাংশ, জন্মগত হৃদরোগ ১৯ শতাংশ, মৃগীরোগ ১৪ শতাংশ, নেফ্রোটিক সিনড্রোমে ২ শতাংশ ও টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ১ শতাংশ শিশু আক্রান্ত।
আইসিডিডিআর,বির আজ ‘ডিজাইনিং অ্যান্ড পাইলটিং পেডিয়াট্রিক এনসিডি সার্ভিস মডেল ফর চিলড্রেন অ্যান্ড এডোলেসেন্টস অ্যাট প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ফ্যাসিলিটিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণার আওতায় প্রথম সাত সপ্তাহে ৩৮৫ জন শিশুর অসংক্রামক রোগ নির্ণয় ও নিবন্ধন করা হয় এবং রোগভেদে এ পরিসংখ্যান উঠে আসে। গবেষণায় বলা হয়, এসব শিশুর মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রেফার করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া অডিটরিয়ামে এক সেমিনারে গবেষণা প্রকল্পের ফল তুলে ধরা হয়। আইসিডিডিআর,বি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সঙ্গে যৌথভাবে এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহযোগিতায় এ গবেষণাটি পরিচালনা করে।
অনুষ্ঠানে গবেষণার প্রধান গবেষক আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, এ গবেষণা বাংলাদেশে শিশুদের অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় একটি টেকসই ও সম্প্রসারণযোগ্য মডেল স্থাপনের ভিত্তি রচনা করেছে। এটি শুধু শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করছে না, বরং তাদের ভবিষ্যতেও সুস্থ ও সক্ষম জীবনযাপনের সম্ভাবনা নিশ্চিত করছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণাটির লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে শিশুদের প্রধান দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগগুলো চিহ্নিত করা এবং এর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে একটি সমন্বিত সেবাদান মডেল তৈরি করা।
আইসিডিডিআর,বি জানায়, ২০১৯ সালের গ্লোবাল বার্ডেন রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বিশ্বে ২১০ কোটিরও বেশি শিশু অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ১০ লাখ শিশু মারা যায়। তবে বাংলাদেশে শিশুদের অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য উপাত্ত নেই। ফলে এসব রোগের চিকিৎসা, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে ঘাটতি রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অসংক্রামক রোগগুলো একটি সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শিশুদের সংক্রামক রোগের ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় চিকিৎসাসেবা প্রটোকল তৈরি করা হয়। ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের ১২টি ও বাগেরহাটের ৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং দুটি জেলা হাসপাতালে এ মডেল কার্যকর করা হয়। এর মাধ্যমে ০-১৭ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে একীভূত করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, শিশুদের অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় এ মডেল গ্রহণযোগ্য ও প্রযোজ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য জাতীয় রোডম্যাপ তৈরি করতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন এ গবেষণার ফল থেকে প্রাপ্ত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর কার্যক্রমকে আরও প্রসারিত করার আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত লিফলেটগুলো কমিউনিটিতে মায়েদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেন।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের ম্যাটারনাল নিউবর্ন চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলসেন্ট হেলথের হেলথ ম্যানেজার দেওয়ান মো. এমদাদুল হক শিশুদের অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন।