বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর বন্দর ও পরিবহন বিভাগে ১৯৯৩ সালে অফিস সহকারী পদে যোগ দেন মাজহারুল ইসলাম। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সময় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত করে ‘বদলিবাণিজ্য’, ‘বন্দর ও ঘাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি’, ‘আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অপরাধে জড়িত তিনি।
এক সময় ছিলেন প্রভাবশালী শ্রমিক লীগ নেতা, এখন এখন হয়েছেন শ্রমিক দল নেতা। তার সহকর্মীদের অভিযোগ, মাজহারুল গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রাতারাতি ভোল পাল্টে শ্রমিক দলের পরিচয় দিয়ে বিআইডব্লিউটিএর কালেক্টিভ বার্গেনিং এজেন্ট (সিবিএ) ও কর্মচারী ইউনিয়ন দখল করে সভাপতি বনে গেছেন।
তিনি আগের সরকারের সময় ছিলেন শ্রমিক লীগের সহসভাপতি ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর মাজহারুলের নেতৃত্বে শ্রমিক দলের অন্যদের নিয়ে তিনি ইউনিয়ন কার্যালয় দখল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে বিআইডব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে জানতাম মাজহারুল আওয়ামী লীগ করেন। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি হঠাৎ বিএনপি হয়ে গেছেন। এখন তিনি বিএনপির সব কর্মসূচিতে যোগ দেন। সেন্টারের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিআইডব্লিউটিএর ইউনিয়ন দখল করেন ও সভাপতি বনে যান। কিন্তু এখানে যারা দীর্ঘদিন নির্যাতন-নিপীড়নে ছিলেন তারা এখনো আগের মতো রয়েছে। টাকা দিয়ে সব নেতাকর্মীকে হাত করে আবারও ইউনিয়ন দখল করে আগের অবস্থাতেই রয়েছেন তিনি।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাজহারুল ইসলাম। তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে উল্লেখ করে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমি আগেও বিএনপি করতাম, এখনো বিএনপি করি। দলের খারাপ অবস্থায় লুকিয়ে মিছিল-মিটিং করেছি। আমি এই ইউনিয়নে ৯ বার নির্বাচন করেছি। ৩ বার সভাপতি ও ৫ বার সাধারণ সম্পাদক হই। এখানে আমার বিরুদ্ধে একটা গ্রুপ লেগেছে। যারা নতুন নতুন বিএনপি হইছে তারাই এই কাজ করছেন। এখন আমাকে এই চক্র আওয়ামী লীগ বানিয়ে দিয়েছে।’
বিআইডব্লিউটিএর প্রবিধানমালা অনুযায়ী কোনো কর্মচারী সরকারি কোনো রাজনৈতিক দল করতে পারেন না। কিন্তু মাজহারুল ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এত বছর শ্রমিক লীগের কমিটিতে ছিলেন। রাতারাতি ভোল পাল্টে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা হয়ে সিবিএ কার্যালয় দখলে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ সংস্থাটির কর্মচারীদের।
সংস্থাটির কর্মকর্তা কর্মচারীদের অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিএ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (রেজি. ইং- বি- ১৪৪০) নির্দলীয় ট্রেড ইউনিয়ন থাকা অবস্থায় শ্রমিক লীগ নেতা মাজহারুল ইসলামসহ তার সহযোগীরা ২০১৫ সালে সিবিএ নির্বাচনের ঠিক আগের দিন মামলা করে নির্বাচন বন্ধ করে দেন এবং নির্বাচনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করান।
পরে তারা নির্দলীয় ট্রেড ইউনিয়নের পরিবর্তে বিআইডব্লিউটিএর অনুকূলে জাতীয় শ্রমিক লীগের ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি অনুমোদন করিয়ে ইউনিয়ন দখল করেন। জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত কমিটির মাধ্যমে দলীয় প্রভাব বিস্তার করেন বিআইডব্লিউটিএতে। সে সময়ে শ্রমিক লীগের কমিটিতে মাজহারুল ইসলাম ১ নম্বর সহসভাপতি এবং তার আপন ছোট ভাই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহিদুল ইসলামকে অর্থসম্পাদক করা হয়। ২০১৫ সালে মাজহারুল ইসলাম চাঁদপুর অফিসের নেতা ছিলেন। শ্রমিক লীগের দাপট দেখিয়ে তিনি ও তার ভাই এতদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মাজহারুল বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে চাঁদা বাণিজ্যের অভিযোগ করেছে। কিন্তু কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে আমি ১০০ টাকা চাঁদা নিয়েছি, তাহালে চাকরি ছেড়ে দেব। এ ছাড়া আমি কোনো দিন বদলিবাণিজ্য করি নাই। আমার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ছবির যে অভিযোগ করছেন তা এডিট করা। এই ছবির বিরুদ্ধে আমি আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছি। জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এটা আমি শুনেছি কিন্তু কোন থানায় বা কোন মামলা এসব কিছুই জানি না।’
অভিযোগ উঠেছে, গত ৫ আগস্টের পরে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জাতীয় শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত বি-১৪৪০ ইউনিয়নের নম্বরটি নিয়ে এবং শ্রমিক দলের কিছু বহিরাগত লোক নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ বি-২১৭৬ (সিবিএ) কার্যালয়টি তালা ভেঙে দখল করে বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠনের নামে বাণিজ্যের। সদরঘাটসহ ঢাকার বিভিন্ন ঘাট থেকে মাসিক চাঁদা দাবি, কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত করে বিভিন্ন কর্মীদের সুবিধাজনক স্থানে বদলি, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের টেন্ডার পাইয়ে দেওয়াসহ নানা অপরাধ কর্মকা-ের অভিযোগ রয়েছে মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
তবে শ্রমআইন এবং শ্রম অধিদপ্তর কর্তৃক কোনো বৈধ কাগজপত্র না নিয়ে গত ৫ আগস্ট জাতীয় শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত সংগঠন বিআইডব্লিউটিএ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (রেজি. নং- বি-১৪৪০) এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দাবি করে মাজহারুল ইসলাম বহিরাগত লোকজন নিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই তালা ভেঙে বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন (রেজি. নং- ২১৭৬) সিবিএ কার্যালয় দখল করেন। অথচ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের (আপিল বিভাগের) রায় অনুযায়ী সিবিএ দখলে নেওয়া বিআইডব্লিউটিএ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (রেজি. নং: বি-১৪৪০) এর বৈধ কোনো নেতৃত্ব নেই। বর্তমানে সংগঠনটির ওপর আদালত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ থাকলেও তা অমান্য করে কার্যক্রম চালাচ্ছে মাজহারুল ইসলাম।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব কুমার দাস বলেন, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা সিবিএ শ্রম অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত হয়ে থাকে, সে মোতাবেক বিআইডব্লিউটিএতে আমরা সিবিএ পরিচালনা করে আসছি। হঠাৎ করে জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আযম খসরুর ক্যাডার হিসেবে পরিচিত মাজহারুল ইসলাম শ্রমিক দলের ব্যানারে আমাদের ইউনিয়নের তালা ভেঙে দখল করেন। আমরা কোনোরকম সংঘাতে না গিয়ে নিয়মানুযায়ী শ্রম অধিদপ্তর এবং বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে লিখিতভাবে জানিয়েছি। আশা করি তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।