আন্দোলনের মুখে পটিয়া থানার ওসি প্রত্যাহার

চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূরকে গতকাল বুধবার রাতে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) আন্দোলনের মুখে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পটিয়ার ওসিকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে পটিয়া থানার ওসির অপসারণের দাবিতে আট ঘণ্টা ধরে সড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। গতকাল বেলা ১১টা থেকে পটিয়া বাইপাস এলাকায় অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু হয়। সন্ধ্যা ৭টায় পটিয়ায় সেনাবাহিনীর সদস্যসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমানের উপস্থিতিতে মহাসড়ক অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণার দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি।

এর আগে গতকাল বিকেলে একই দাবিতে চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করে সংগঠন দুটির নেতাকর্মীরা। তারা ডিআইজিকে কার্যালয়ের বাইরে এসে তাদের সঙ্গে কথা বলার দাবি জানান। কিন্তু এতে ডিআইজির সম্মতি না পেয়ে তারা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জাকির হোসেন সড়কে অবরোধ শুরু করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপির নেতাকর্মীরা। তবে প্রায় তিন ঘণ্টা পর পথ ছাড়েন তারা। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টা ও সাড়ে ১১টায় পটিয়া থানা-পুলিশের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের দুই দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ১৯ জন আহত হয় বলে দাবি করেছে উভয়পক্ষ। তবে নেতাকর্মীদের দাবি, পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ বলছে, নেতাকর্মীরা ‘মব’ সৃষ্টি করছিল।

এর প্রতিবাদে গতকাল পটিয়া থানা ঘেরাওয়ের ডাক দেয় সংগঠনটি। এদিন সকাল ৯টার থেকেই থানা ঘেরাও শুরু করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। পরে খণ্ড খণ্ড মিছিলে এসে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করেন। সেখানে স্লোগান দিয়ে পটিয়া থানার ওসি আবু জাহেদ মো. নাজমুন নূরের অপসারণ দাবি করেন তারা।

তাদের অবরোধের কারণে সারা দিন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া অংশে কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারেনি। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা চেষ্টা করেও সড়কে গাড়ি চলাচল করতে পারেনি। এতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ জনগণ।

এদিকে সড়ক থেকে সরে গেলেও বুধবার রাতের মধ্যে পটিয়া থানার ওসিকে প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কঠোর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, ছাত্রলীগ নেতা দীপংকরকে স্থানীয় জনতা আটক করে পটিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলেও, তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। উল্টো এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গেলে এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। এতে অন্তত ১৫ নেতাকর্মী আহত হন।

এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর সংগঠক রিয়াদ বলেন, ‘যেখানে জনগণ এক দুর্নীতিগ্রস্ত ছাত্রনেতাকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে, সেখানে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর চড়াও হয়েছে। এটি প্রমাণ করে পুলিশ বাহিনী এখন রাজনৈতিক রক্ষাকবচে পরিণত হয়েছে। তাই আমরা দ্রুত পুলিশ সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি।’

পটিয়ার ঘটনায় নেপথ্য কারণ বের করার দাবি জেলা বিএনপি নেতার : পটিয়া থানা পুলিশ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের মধ্যে সংঘটিত ঘটনার নেপথ্য কারণ খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার জন্য পুলিশ কিংবা অন্য কোনো পক্ষ যারাই দায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

বুধবার বিকেলে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া এক পোস্টে জেলা বিএনপির এই শীর্ষ নেতা লিখেন, ‘গতকাল কিছু ব্যক্তি একজন লোককে আটক করে থানায় সোপর্দ করতে গেলে মামলা না থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারে অনীহা প্রকাশ করলে উচ্ছৃঙ্খল জনতা থানায় হামলা করেছে বলে থানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য থেকে জানা গেছে। আটক ব্যক্তি যদি ফ্যাসিবাদী খুনি চক্রের সদস্য হয় তাহলে তাকে অবশ্যই আইনের হাতে সোপর্দ করা উচিত ছিল। আবার এটার প্রতিবাদে ওসির অপসারণ দাবিতে থানায় হামলা বা রাস্তায় ব্লকেড দেওয়া এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। এতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রোডে জনসাধারণের চলাচলে ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।’

বিএনপি নেতা লায়ন হেলাল প্রশ্ন রাখেন ‘পুলিশের অপরাধ বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর ফোরামে অভিযোগ-মতামত জানানোর ব্যবস্থা আছে। তাহলে কেন পটিয়ার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, যিনি পটিয়ার বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা বলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনিও ঐ একই ফ্যাসিবাদী দলের লোক। লোকজন যাকে পুলিশে দিতে চাচ্ছে তার সঙ্গে ঐ নেতার পূর্ব সম্পর্ক ছিল। তাহলে এটার পেছনে আসল কারণ কী তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব প্রশাসনের।’

ফেসবুক পোস্টের বিষয়টি নিশ্চিত করে লায়ন হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন হাতে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কেউ অপরাধ করলে অবশ্যই আইনানুযায়ী তার বিচার হবে এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।’

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার রাতে পটিয়ায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে ধরে থানায় সোপর্দ করা নিয়ে পুলিশ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে উভয় পক্ষ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। এ ঘটনার জের ধরে বুধবার দিনভর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কয়েকটি জায়গায় অবরোধ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা। বিকেলে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির অফিসও ঘেরাও করেন তারা।