চালে উচ্চমূল্য, ডিমের দাম কমল

বোরোর ভরা মৌসুমেও উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে চাল। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চালের বাজারে সিন্ডিকেট থাকার অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। ফলে চাপে পড়েছে সীমিত আয়ের মানুষ। তিন মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার যে ধারাবাহিকতা ছিল, তাতে আবার উল্টো চিত্র দেখা যেতে পারে চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে।

ঢাকার কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চালের উচ্চমূল্য থাকলেও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। যেমন পেঁয়াজ, আলু, সবজি, আটা প্রভৃতি পণ্যের দাম সহনীয়। আরও কমতে শুরু করেছে ডিমের দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ডজন ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম কমেছে অন্তত ১০ টাকা। এখন প্রতি ডজন ডিম কেনা যাচ্ছে ১১৫-১২০ টাকায়। স্থিতিশীল রয়েছে ব্রয়লার মুরগির দামও। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ঢাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪৫-১৬০ টাকায়।

চালের দাম নিয়ে প্রতিদিনই প্রতিবেদন তৈরি করে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। টিসিবির গতকাল বৃহস্পতিবারের প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার বাজারে চিকন চাল কিনতে খরচ হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা, যা গত মাসের দামের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। তবে চিকন চালের নিম্নস্তরের যে চালগুলো গত সপ্তাহে ৭২ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেগুলো এখন ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোয় চিকন চাল সর্বোচ্চ ৮৮-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির তথ্য বলছে, এক সপ্তাহ আগে মোটা চাল প্রতি কেজি ৫৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন ৬০ টাকা হয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১৫ শতাংশ।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর পরিচালিত বাজারদর অ্যাপের তথ্য বলছে, ঢাকায় চিকন চালের সর্বোচ্চ দাম ৯০ টাকা। তবে এটা হচ্ছে গত আমন মৌসুমের চাল।

চাল নিয়ে প্রায় এক মাস ধরে কাদা ছোড়াছুড়ি হচ্ছে। মিলাররা বলছেন, তারা বেশি দাম দিয়ে ধান কিনছেন, ফলে চালের দাম বেড়েছে। এদিকে কৃষকের ঘরের ধান শেষ হওয়ার পরই বেড়েছে ধানের দাম। মিলাররা বলছেন, ফড়িয়া, পাইকারের মতো মজুদদাররাই আসলে ধানের দাম বাড়িয়েছেন। তবে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, ফড়িয়া মজুদদারের চেয়েও বেশি দাম রাখেন মিল মালিকরা। করপোরেট মিল মালিকদের ধারণক্ষমতাও বেশি। তারা কম দামে ধান কিনে এবং বাজারে দাম বাড়লে সেই দামের সঙ্গে সমন্বয় করে চাল বিক্রি করেন। গত এক মাসে ঢাকায় ৫০ কেজির চালের বস্তার দাম বেড়েছে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধানের দাম বেড়েছে মণপ্রতি ৩০০-৩৫০ টাকা। ধানের দামের হিসাবে কোনোভাবেই কেজিপ্রতি ৮ টাকা চালের মূল্যবৃদ্ধি সামঞ্জ্যস্যপূর্ণ নয়। এ জায়গায় সরকারের মনিটরিংয়ে ঘাটতি রয়েছে, ফলে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন এবং একে অন্যকে দোষারোপ করে দাম বাড়াকে বৈধতা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ মেজর, অটো ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধানের দাম বাড়ার কারণে চালের দাম বেড়েছে। এর মূল কারণ পণ্যটি এখন ফড়িয়া, পাইকারের হাতে।’

তিনি দাবি করেন, ‘চালের দাম বাড়লে মিলারদের দায়ী করা হয়, আমরা চাই এটার জন্য অভিযান হোক। যারা অবৈধ মজুদ করে মিলারদের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।’

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের দাম বাড়লে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। ধারাবাহিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমতে থাকার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল, সেটি হয়তো এবার বাধার মুখে পড়বে।

বিবিএসের হিসাব থেকে জানা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতির হিসাবের ঝুড়িতে যেসব পণ্য থাকে, তার মধ্যে এককভাবে চালের দামের প্রভাব সর্বোচ্চ এবং এর অবদান ৪০ শতাংশের বেশি। তিন মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে। গত মার্চে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশে নামে, যা এপ্রিলে কমে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং মে মাসে আরও খানিকটা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশে।

সস্তা প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত ব্রয়লার মুরগির দাম মাস কয়েক ধরেই কম। গত সপ্তাহে এটি আরও কমেছে। কম দামের কারণে ভোক্তারা স্বস্তিতে থাকলেও উৎপাদন খরচের চেয়ে কমমূল্যে ডিম-মুরগি বিক্রি হওয়ায় খামারিদের ওপর একটা চাপ তৈরি হয়েছে। ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম এখন ডজনপ্রতি ১১৫-১২০ টাকা, যা গত সপ্তাহেও ছিল ১৩০ টাকা। প্রায় চার বছরের মধ্যে এ দামে ঢাকার বাজারে ডিম বিক্রি হয়নি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুরগির বাচ্চার দাম কমে যাওয়ার কারণে এক দিনের বাচ্চা উৎপাদনকারীরা যেমন সংকটে পড়েছে, তেমনি মুরগি পালন করে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না খামারিরা। এখন এক কেজির ব্রয়লার মুরগি ১১০-১১৫ টাকাতেও বিক্রি করতে পারছেন না তারা অথচ ঢাকার বাজারে মুরগির দাম ১৪৫-১৬০ টাকা। ডিম-মুরগির উৎপাদনকারীরা দাম না পেলেও বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যস্বত্বভোগী ঠিকই লাভ তুলে নিচ্ছেন।