ইসলামের ইতিহাস ও চেতনায় মহররম মাস এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। আরবি বছরের সূচনা এই মাস দিয়ে হলেও এর তাৎপর্য কেবল ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস হওয়ার কারণে নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মানিত চার মাসের একটি। এ মাসে সংঘটিত হয়েছে বহু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা একদিকে যেমন ইতিহাসের স্মারকচিহ্ন, অন্যদিকে তেমনি আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির প্রেরণাও। এই মহররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় আশুরা, যা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ এক দিন হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
আশুরার তাৎপর্য কেবল কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এ দিনটির মর্যাদা ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকেই স্বীকৃত। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে বনি ইসরাঈল ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি লাভ করেছিল এই দিনেই। সেই আনন্দে মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন, যা পরে ইহুদিদের মধ্যে চালু ছিল। মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) এ রেওয়াজ অবলোকন করে বলেন, ‘আমি মুসা (আ.)-এর প্রতি তোমাদের অপেক্ষা অধিক হকদার।’ অতঃপর তিনি নিজেও রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন।
আশুরার রোজা ইসলামের প্রথমদিকে ওয়াজিব ছিল, পরে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর এটি মুস্তাহাব হিসেবে পালিত হয়। রাসুল (সা.) আশুরার রোজাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুটি রোজা রাখার কথা বলেছেন, যাতে ইহুদি-নাসারাদের অনুকরণ না হয়। সাহাবিরা তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতেন এবং এমনকি শিশুদেরও রোজায় অভ্যস্ত করতেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) মদিনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে রোজা রাখো কেন?) তারা বলল, এ অতি উত্তম দিন, এ দিনে আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল থেকে নাজাত দান করেন, ফলে এ দিনে মুসা (আ.) রোজা রাখেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, আমি তোমাদের অপেক্ষা মুসার অধিক নিকটবর্তী, এরপর তিনি এ দিনে রোজা রাখেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি) আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে আমি আশা পোষণ করি যে, তিনি আশুরার রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের (গুনাহ) ক্ষমা করে দেবেন। (জামে তিরমিজি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ১০ মহররমের সঙ্গে ৯ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ৯ তারিখে রাখতে পারলে ভালো। কারণ হাদিসে ৯ তারিখের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) যখন আশুরার রোজা রাখছিলেন এবং অন্যদের রোজা রাখতে বলেছিলেন তখন সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এ দিনকে তো ইহুদি-নাসারারা সম্মান করে। তখন নবীজি (সা.) এ কথা শুনে বললেন, ইনশাআল্লাহ, আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব। বর্ণনাকারী বললেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এমতাবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম)
রোজার পাশাপাশি এই দিনে তওবার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যদিও তওবা-ইসতেগফার যেকোনো সময় করা যায়। তবে কিছু সময় এমন রয়েছে, যা তওবার বেশি অনুকূল। বান্দার উচিত সেই প্রত্যাশিত মুহূর্তগুলোকে কাজে লাগানো। মহররমের এ মাসটি, বিশেষ করে ১০ তারিখ এমনই এক মোক্ষম সময়। এক সাহাবি নবীজির কাছে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল! রমজানের পর আপনি কোন মাসে রোজা রাখতে বলেন? নবীজি বললেন, তুমি যদি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও তাহলে মহররমে রোজা রাখো। কেননা মহররম হচ্ছে আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন এক দিন আছে, যেদিন মহান আল্লাহ (অতীতে) অনেকের তওবা কবুল করেছেন। ভবিষ্যতেও অনেকের তওবা কবুল করবেন। (জামে তিরমিজি)
তাই আশুরায় আমরা রোজা রাখার পাশাপশি দোয়া-জিকির, তওবা-ইসতেগফারসহ অন্যান্য আমলের প্রতিও মনোনিবেশ করব, যাতে আমাদের ওপর আল্লাহর রহমত প্রবলভাবে বর্ষিত হয় এবং অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা হয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দান করুন। আমিন।