দুই থানায় পুলিশের দুই মামলা, গ্রেপ্তার ৯

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজাপ্রাপ্ত দুই বিএনপি কর্মীকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার রেশ ছড়িয়েছে আশপাশের থানা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। হামলা, ভাঙচুর, পুলিশের গাড়ি আটকে দেওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনায় দুই থানায় দুটি মামলা দায়ের হয়েছে। ঘটনার জেরে পাটগ্রামের দুই বিএনপি-যুবদল নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং পুলিশ দুই দিনে মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে বিএনপি দাবি করছে, ‘সাজানো ঘটনা’ ও ‘ইজারা সিন্ডিকেটের’ স্বার্থরক্ষা করতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি প্রশাসনিক পরিস্থিতিও হয়ে উঠেছে সংবেদনশীল।

ঘটনার সূত্রপাত : গত বুধবার সন্ধ্যায় পাটগ্রাম উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। অভিযানে বিএনপি সংশ্লিষ্ট দুই কর্মীকে এক মাসের কারাদ- দিয়ে থানায় পাঠানো হয়। পরে সন্ধ্যার পর থানা চত্বরে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং এক পর্যায়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, একটি দল থানায় ঢুকে সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। হামলায় ওসি মিজানুর রহমানসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।

পুলিশি সহায়তা আটকে দেওয়ার অভিযোগে হাতীবান্ধায় মামলা : ঘটনার সময় পাটগ্রামে উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য হাতীবান্ধা থানা থেকে একটি পুলিশ দল রওনা দেয়। কিন্তু থানার গেটেই ব্যারিকেড সৃষ্টি করে তাদের অন্তত ৪০ মিনিট আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ হাতীবান্ধা থানা পুলিশের।

হাতীবান্ধা থানার ওসি মাহমুদুন-নবী বলেন, ‘৭০-৮০টি মোটরসাইকেল দিয়ে থানার ফটক আটকে রাখা হয়। গালাগাল, হুমকি, এমনকি ধাক্কাধাক্কিরও ঘটনা ঘটে। উদ্দেশ্য ছিল যেন আমরা পাটগ্রামে পৌঁছাতে না পারি।’

এ ঘটনায় হাতীবান্ধা থানার এএসআই শাহেদুল ইসলাম বাদী হয়ে ২৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও শতাধিক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। এতে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের নেতারা রয়েছেন।

বহিষ্কার দুই নেতা : ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাটগ্রাম পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদ হোসেন এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য বাদশা জাহাঙ্গীর মোস্তাজিরকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাহমুদ হোসেনকে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত থাকায় প্রাথমিক সদস্যপদসহ যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

একইভাবে জেলা বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাদশা মোস্তাজিরকে সাম্প্রতিক কর্মকা-ের কারণে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ৯ জন, অভিযান অব্যাহত : পাটগ্রাম থানায় হামলা, সরকারি কাজে বাধা, ভাঙচুর এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাতজন। এদের মধ্যে রয়েছেন সোহেল রানা নামের সেই আসামিও, যাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে হাতীবান্ধা থানায় পুলিশের অবরোধের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নুরুন্নবী কাজল এবং মাহফুজার রহমান বিপ্লবকে।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বাকি আসামিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

বিএনপির পাল্টা বক্তব্য : বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাসান রাজীব প্রধান গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘পুলিশ পাথর ইজারাদারের দুই কর্মীকে বিনা কারণে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। এতে উত্তেজনা ছড়ালেও বিএনপি হামলার সঙ্গে জড়িত নয়।’

তিনি আরও দাবি করেন, একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করায় আমাদের নেতাকর্মীদের ফাঁসানো হচ্ছে।

স্থির পরিস্থিতি, শঙ্কায় সাধারণ মানুষ

ঘটনার পর পাটগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গ্রামে-গঞ্জে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, যারা প্রকৃত অপরাধী, তাদের আইনের আওতায় আনুক। কিন্তু যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার না হয়।

পুলিশ সুপারের ভাষ্য : লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধার ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। কোনো অপরাধীই ছাড় পাবে না।’