ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া ব্রিকস জোটের ১৭তম শীর্ষ সম্মেলন বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। দুদিনব্যাপী এ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর নেতারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর প্রভাব নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়েছেন যে, যেসব দেশ ব্রিকস জোটের ‘যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ নীতিতে যুক্ত হবে, তাদের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এ নীতির কোনো ব্যতিক্রম হবে না। ট্রাম্পের এ হুমকি ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে জড়িত।
গত বছর ট্রাম্প ব্রিকসের নিজস্ব মুদ্রা চালুর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। এবারের ১০ শতাংশ শুল্কের হুমকি তার পূর্ববর্তী অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা, যা ব্রিকস জোটকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে।
ব্রিকস সম্মেলনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে জোটের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনে ব্রিকস জোট ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৩ জুন থেকে শুরু হওয়া এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। বিশেষ করে ইরানের নাতাঞ্জ, ফোর্দো ও ইসফাহানের পরমাণু স্থাপনায় হামলাকে ‘বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ইচ্ছাকৃত আক্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করে জোট গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ বিবৃতি তেহরানের জন্য একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্রিকস জোট গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। জোটটি গাজা উপত্যকা ও অন্যান্য অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
সম্মেলনে ব্রিকস নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতিকে ‘অবৈধ’ এবং ‘বিশ্ববাণিজ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে সমালোচনা করেছেন। অর্থমন্ত্রীদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এ শুল্ক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। জোটটি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-কেন্দ্রিক, নিয়মভিত্তিক ও স্বচ্ছ বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ব্রিকস নেতারা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ পদ্ধতিতে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে বহুপাক্ষিকতার প্রতি তাদের অঙ্গীকারের অংশ। এ ছাড়া সম্মেলনে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে। তবে ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এ আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে।
এদিকে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির জবাবে ব্রিকস জোট এখনো কোনো সরাসরি পাল্টা পদক্ষেপ ঘোষণা করেনি। তবে সম্মেলনে জোটের সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে মার্কিন শুল্কনীতির সমালোচনা করেছেন। অর্থমন্ত্রীদের বিবৃতিতে এ শুল্ককে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
ব্রিকস নেতারা জোটটিকে বহুপাক্ষিকতার রক্ষক এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে ব্রিকসকে স্নায়ুযুদ্ধের আমলের ‘নন অ্যালাইনড মুভমেন্ট’ (ন্যাম)-এর উত্তরসূরি হিসেবে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘বহুপাক্ষিকতা হামলার মুখে থাকায় আমাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’
জোটের ভেতরে মতপার্থক্যও লক্ষণীয়। কিছু সদস্য দেশ যেমন ইরান ও মিসর, গাজায় ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের পক্ষে ছিল, যখন অন্যরা এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। এই মতপার্থক্য জোটের ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের অনুপস্থিতি জোটের সংহতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। শি জিনপিংয়ের পরিবর্তে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এবং পুতিনের পরিবর্তে রুশ প্রতিনিধি সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। পুতিনের অনুপস্থিতির কারণ ইউক্রেন যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, যেহেতু ব্রাজিল রোম সংবিধির স্বাক্ষরকারী দেশ।
এই অনুপস্থিতি জোটের বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার উপস্থিতি সম্মেলনকে গতি দিয়েছে।
ব্রিকস জোট বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে জোটটি ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আলজাজিরার সাংবাদিক লুসিয়া নিউম্যান বলেন, ‘ব্রিকসের লক্ষ্য বহুমেরু বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় চাপ সৃষ্টি করা, যেখানে গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পাবে। তবে ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অগ্রাধিকার নিয়ে জোটটি কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে, তা একটি বড় প্রশ্ন।’
ব্রিকস সম্মেলন ২০২৫ ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জোটটি ইরান ও গাজার প্রতি সমর্থন জানিয়ে কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে, তবে ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ এখনো স্পষ্ট নয়। জোটের ঐক্য এবং বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।