জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা কোনো পরিস্থিতিতেই যেন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত না হয়, সেটা নিশ্চিত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত। তিনি বলেন, বিদ্যমান সংবিধানের ১৪১ নম্বর অনুচ্ছেদের (ক), (খ), (গ)-এর সবকিছুর ক্ষেত্রে সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন করার ব্যাপারেও দলগুলো একমত।
গতকাল সোমবার ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের দশম দিনের আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের অধ্যাপক আলী রীয়াজ এসব কথা বলেন। গতকালের আলোচ্য সূচিতে ছিল উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালতের সম্প্রসারণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং নারী প্রতিনিধিত্ব। ড. রীয়াজ বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) আবারও আলোচনা হবে। এদিন নারী প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, আজকের (গতকালকের) আলোচনা সফল হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে ধন্যবাদ জানাই তারা দলীয় কার্যক্রমের বাইরে সময় দিয়েছে।
এ সময় কমিশনের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
সভায় ড. আলী রীয়াজ জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আজ জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণ এ দুটি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিদ্যমান সংবিধানের ১৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়টি আছে, যা নিয়ে অতীতে খুব বেশি আলোচনার সুযোগ ছিল না। আজ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পূর্ববর্তী আলোচনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ঐকমত্য কমিশন হতে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়ে সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ প্রস্তাব নিয়ে পরবর্তী সভায় অধিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ভবিষ্যতের আলোচনায় সুস্পষ্টভাবে বলা যাবে এ ব্যাপারে কতটুকু একমত হওয়া গেছে।
ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল এবং জোটগুলো উপজেলা পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একমত পোষণ করেছে বলে জানান ড. আলী রীয়াজ। তবে দল এবং জোটগুলো অধস্তন আদালত সম্প্রসারণের জন্য কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করে। যেমন, সদর উপজেলাগুলোর আদালতসমূহ জেলা জজ কোর্টের সঙ্গে সংযুক্ত রেখে সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। বিদ্যমান চৌকি আদালত, দ্বীপাঞ্চল এবং ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত আদালতগুলো বহাল রেখে এর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। জেলা সদরের কাছাকাছি উপজেলাগুলোয় নতুন আদালত স্থাপনের প্রয়োজন নেই। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জরিপের দরকার। অবশিষ্ট উপজেলাগুলোর জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য, যাতায়াত ব্যবস্থা, দূরত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থা, মামলার সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে স্থাপন করা। অধস্তন আদালতের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। আইনগত সহায়তা কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আজকের আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
উপজেলা পর্যায়ে নিম্ন আদালত ও জরুরি আইন সংস্কারে বিএনপির আপত্তি নেই : বিএনপি
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত গঠন ও জরুরি আইন সংস্কারে বিএনপির আপত্তি নেই। এ নিয়ে অন্য দলগুলোও ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তবে এ ক্ষেত্রে আইনের সঠিক প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের দশম দিনের সংলাপের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় আইনি সেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণের বিষয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই একমত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন কেউ কেউ।
তিনি বলেন, প্রথমত জেলা সদরে জেলা জজ আদালত বিদ্যমান থাকায় সেখানে নতুন করে আদালতের প্রয়োজন নেই। আমার জানামতে, সারা দেশে উপজেলা আদালত রয়েছে ৬৭টি। সেগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। দ্বিতীয়ত জেলা সদর ১৫-২০ কিলোমিটার সীমার মধ্যে থাকলে বা সুযোগ-সুবিধা থাকলে সেখানেও প্রয়োজন নেই। তৃতীয়ত জন-ঘনত্ব ও অর্থনৈতিক বিবচনা করে কিছু উপজেলায় অধস্তন আদালত বিকেন্দ্রীকরণ করা যেতে পারে। এ বিষয়ে আরও আলোচনার দাবি রাখেন তিনি।
বিএনপি কেন উপজলা আদালত তুলে নিল এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার হওয়ার পর তখনকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বন্ধ করা হয়। হয়তো তখনকার বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ৩৫ বছর পর নতুন বাস্তবতার কারণে আবার এর পক্ষে প্রস্তাব এসেছে।
জরুরি আইনের সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের কোনো প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবেন, কী কী শর্ত থাকবে, সংসদ থাকলে বা না থাকলে কোন প্রক্রিয়ায় হবে, সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিএনপির এ নেতা বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়, মৌলিক বিষয় পরবর্তী সংসদে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি থাকা অবস্থায় যেন মৌলিক ও মানবাধিকার খর্ব করা না হয়, সে বিষয়ে সবাই একমত। আমাদেরও আপত্তি নেই। কোনো কারণে যেন অপব্যবহার না হয়। এ নিয়ে আরও আলোচনা করতে হবে।
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তিনটি বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছি। তবে উপজেলা পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে অধস্তন আদালত গঠন করার ক্ষেত্রে একমত এবং চৌকিগুলো স্থায়ী আদালত করা হবে।
জামায়াতের এ নেতা বলেন, আজকের আলোচনায়-১৪১ এর ক, খ ও গ-তে জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, বহিঃশত্রু আক্রমণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা উল্লেখ আছে। তবে পাঁচবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। এটির যেন আর অপব্যবহার না হয়, সেটার বিষয় কথা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভায় লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হবে। এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে জামায়াত। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে করাতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থায় যেন স্বাভাবিক গতিধারা ব্যাহত না হয়, সেটার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।