গ্যাসসংকটে বন্ধ সিইউএফএল

গ্যাসের অভাবে প্রায় তিন মাস (৮৮ দিন) ধরে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় ৪০১ কোটির বেশি টাকার সার উৎপাদিত হয়নি। কারখানার ৯ শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারীর মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত এ সার কারখানা অবস্থিত। গত ১১ এপ্রিল গ্যাসের অভাবে কারখানাটির ইউরিয়া সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানার ব্যয় মেটানো বাবদ প্রতি মাসে ২০ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে সিইউএফএল কর্তৃপক্ষ। বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) থেকে আন্তর্জাতিক দরে সার কিনতে গিয়ে সরকারকে মোটা অঙ্কের ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে। উন্নত মানের কারণে অন্য সারের চেয়ে সিইউএফএল কারখানার ইউরিয়া সারে কৃষকদের আগ্রহ বেশি। চলতি আবাদ মৌসুমে কারখানা চালু না হলে কৃত্রিম সার সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।

বর্তমানে দৈনিক ১২০০ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করে সিইউএফএল। প্রতি টন সার ৩৮ হাজার টাকা করে ডিলারদের কাছে বিক্রি করা হয়। এ হিসাবে কারখানাটিতে দৈনিক ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকার সার উৎপাদিত হয়। এ হিসাবেই ৮৮ দিন বন্ধ থাকায় ৪০১ কোটি ২৮ লাখ টাকার সার উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়েছে কারখানাটি। ব্যয় মেটাতে প্রতি মাসে তাদের গুনতে হচ্ছে অন্তত ২০ কোটি টাকা।

১৯৮৭ সালের ২৯ অক্টোবর জাপানের কারিগরি সহায়তায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় সার কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করে সরকার। বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন কারখানাটি চালু হওয়ার সময় দৈনিক ১৭০০ টন এবং বার্ষিক ৫ লাখ ৬১ হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল। বার্ষিক ৩ লাখ ১০ টন অ্যামোনিয়া উৎপাদন করতে পারে কারখানাটি। বর্তমানে গ্যাসের চাপ ও নানা কারণে কারখানায় দৈনিক ১২০০ টন ইউরিয়া সারের উৎপাদন হয়। এসব সার বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলারদের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ দেশের ২৫টি জেলায় সরবরাহ করা হয়।

সিইউএফএল সূত্র জানায়, গত দুই বছর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এবং গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র পাঁচ দিন চালু ছিল কারখানা। গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ১৩ অক্টোবর কারখানাটি চালু করা হয়। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি আবার যান্ত্রিক ত্রুটির (রি-অ্যাক্টরের সমস্যা) কারণে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। মেরামতের পর ২৬ ফেব্রুয়ারি আবার উৎপাদন শুরু হয়। দেড় মাস নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চললেও গত ১১ এপ্রিল গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় কারখানাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। সম্পূর্ণ গ্যাসনির্ভর এ কারখানায় পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য দৈনিক ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকায় গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

টানা প্রায় তিন মাস উৎপাদন বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে কারখানা-সংশ্লিষ্ট ট্রাকচালক ও দিনমজুররা। দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকায় কষ্টে দিন পার করছে তাদের পরিবার। সালাউদ্দিন নামের এক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা এখানে ৩০০-এর মতো শ্রমিক আছি। যখন কারখানা চালু ছিল, তখন সংসার খুব ভালোভাবে চলত। এখন উৎপাদন হয় না, বেতনও ঠিকমতো পাই না।’

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুল আজিম সবুজ বলেন, ‘গ্যাসসংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকায় গত অর্থবছরে মাত্র পাঁচ দিনের জন্য সিইউএফএলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে উৎসব বোনাস পায়নি শ্রমিকরা।’ লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করে শ্রমিকদের উৎসব বোনাস দেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত গ্যাসের ব্যবস্থা করে কারখানা চালু করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।

সিইউএফএলের উৎপাদন বিভাগের প্রধান উত্তম চৌধুরী বলেন, ‘গ্যাসের অভাবে টানা ৮৮ দিন ধরে বন্ধ আছে সিইউএফএল। গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার চেষ্টা করছি। তবে কখন গ্যাস পাওয়া যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নই।’

সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘উৎপাদনের ক্ষতির পাশাপাশি কারখানার ব্যয়ও মেটাতে হচ্ছে। কারখানা বন্ধ থাকলে বাতাসের সঙ্গে যেসব ধূলিকণা থাকে, সেই মেশিনগুলোর জন্য ক্ষতিকর। মেশিনগুলোর ক্ষয় হতে থাকে। একটা মেশিন কিছুদিন বন্ধ থাকলে আবার চালু করার সময় অনেক ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে কারখানা প্রস্তুত রয়েছে, গ্যাস পেলেই উৎপাদন শুরু হবে।’

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিউল আজম খান বলেন, ‘সিইউএফএলে গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে এখনো সরকারের নির্দেশনা পাইনি।’