টাকা দিয়ে জেল খাটার সুযোগ

অপরাধীর জন্য তৈরি হয় জেলখানা। কেউ অপরাধ করলে আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে জেলখানায় রাখা হয়। সবাই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টায় মগ্ন থাকেন। তবে যারা কখনো জেলে যাননি, তাদের কাছে এ নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। কেমন কয়েদির জীবন? কী হয় সেখানে? সিনেমায় কারাগারের যে জীবন দেখা যায়, বাস্তবে কি তাই? গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, নাটকে ‘কারাগার’ একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। কারাগারে থাকার কৌতূহল আছে অনেকের। কিন্তু অপরাধ না করলে তো আর কারাগারে যাওয়া যায় না। তবে অপরাধ না করেও এবার কারাগারে থাকার সুযোগ আসছে। তবে কারাবন্দি থাকার সুযোগ-সুবিধা সাধারণ কয়েদির মতোই।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো জেলখানা সাজানো হচ্ছে। যে কেউ চাইলে এখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জেল খাটতে পারবেন। বিনিময়ে দিতে হবে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি। নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো জেলখানায় কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্পে এমন জেল তৈরি করা হচ্ছে। একটি অংশের নাম রাখা হয়েছে ‘ফিল দ্য জেল’।

প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হতে আগামী বছর লেগে যেতে পারে। তবে একাংশের কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে। হস্তান্তর শেষে আগামী অক্টোবর মাসেই এই অংশ উদ্বোধন হতে পারে। যেখানে থাকে প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস-সংবলিত জাদুঘর, খেলার মাঠ, মসজিদ, জিমনেশিয়াম, সুইমিং পুল, মার্কেট, সুপার শপ ও গাড়ি পার্কিংসহ নানা স্থাপনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ‘পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও পারিপার্শ্বিক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্পটি এ, বি ও সি জোনে ভাগ করা হয়। পুরনো কারাগারটির উত্তর অংশে এ জোন, দক্ষিণ অংশে বি জোন এবং মাঝখানে সি জোন করে কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্পটি ডিজাইন করা হয়েছে।

এর মধ্যে এ ও বি জোন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে সি জোনে প্রবেশ করতে কাটতে হবে টিকিট। ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন ছাড়াও জেলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ থাকবে এই জোনে। এজন্য ‘ফল দ্য জেল’ নামের আলাদা একটি সাব-জোন তৈরি করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা সেনানিবাসের ‘ই এন সিজ ব্রাঞ্চ ওয়ার্কস ডাইরেক্টরেট’ এবং কারা অধিদপ্তর।

অক্টোবরে একাংশের উদ্বোধন : প্রকল্পের সেকশন বি জোনের কাজ প্রায় শেষ। আগামী অক্টোবরে এ অংশের উদ্বোধন হতে পারে। এই জোনের কাজ করছে রূপায়ণ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। প্রকল্পের এ অংশে রয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, খাবার ও বইয়ের দোকান-সংবলিত দোতলা চক কমপ্লেক্স, পুকুর ও ওয়াকওয়ে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুরান ঢাকায় এই প্রকল্পের কাজ এমনভাবে করা হচ্ছে, যাতে আগামী ২০০ বছর টিকে থাকবে। জোনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আকৃষ্ট হন এবং ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারেন। আশপাশের রাস্তাগুলো প্রশস্ত করা হবে। এখানে চক মার্কেটের আদলে একটি কমপ্লেক্স থাকছে, যেখানে ৪১টি দোকান রয়েছে। দোকানগুলোয় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারসহ বিভিন্ন জিনিস থাকবে। খেলার মাঠ, ফুটবল মাঠ, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, পার্ক, শিশু পার্কসহ নানা স্থাপনা থাকছে এই জোনে।

ঐতিহাসিক এ প্রকল্পে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। যেখানে উন্নত প্রযুক্তির লাইটিং ছাড়াও নানা নকশায় পরিপূর্ণ। ইবাদত করার পাশাপাশি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হয়ে থাকে এই মসজিদটি। তা ছাড়া বি সেকশনে ইলেকট্রো মেকানিক্যাল রুম, ড্রাইভারের বিশ্রামাগার, ৮৯টি কার পার্কিং, দোকান, ক্যাফেটেরিয়া, সুপারশপ, কোর্ট ইয়ার্ড, টয়লেট ও গ্রিন রুফ থাকছে। যেগুলোর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

প্রকল্পের তথ্যমতে, বি সেকশনের কাজ শুরু হয়েছে ২০২১ সালের ৩০ জুন। সমাপ্তির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর। এর আগেই সব কাজ শেষ করেছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। তাদের আশা, নির্ধারিত সময়ের আগেই পুরো কাজ সরকারকে বুঝিয়ে দিতে পারবে।

আলাপকালে রূপায়ণ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ডিরেক্টর অপারেশনস লিমিটেড কর্নেল (অব.) কবির উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব কাজ শেষ। এখন চূড়ান্তভাবে দেখে কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া। নির্দিষ্ট সময়ের পর এক দিনও দেরি করা হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পের কাজের সময় রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান স্যার বলেছিলেন, এর মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে যাচ্ছি, অংশ হতে যাচ্ছি। তাই মান এবং বুঝিয়ে দেওয়ার সময় নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না। চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী মুনাফা বা ক্ষতির দিকে আমরা তাকাইনি। বিদেশ থেকে অনেক নির্মাণসামগ্রী আনা হয়েছে, যাতে আগের মতো হয়। বাংলাদেশে প্রথম এমন একটি কাজ হয়েছে, যেটা আমরা করেছি।’

ফিল দ্য জেল : সি সেকশনে তৈরি করা হচ্ছে ‘ফিল দ্য জেল’। যেখানে কারাগারের কয়েদিদের প্রথমে কীভাবে রিসিভ করা হয়, তাদের দৈনন্দিন কর্মকা-, সশ্রম কারাদ-প্রাপ্তদের কীভাবে দিন কাটে, বিনাশ্রম কারাদ-প্রাপ্তদের অবস্থা, কারাগারে থাকার জায়গা, খাবারের জায়গা, কীভাবে গোসল করেনÑ সব মিলিয়ে কারাবন্দিদের থাকার অনুভূতি তৈরি করা হবে। কেউ যদি চান টাকা দিয়ে কারাবন্দি উপভোগ করতে পারবেন।

সূত্র বলছে, ‘ফিল দ্য জেল’ তৈরি করার জন্য জনবল প্রয়োজন হবে। কারা কর্তৃপক্ষ সেই জনবল নিয়োগ দেবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরপরই ফিল দ্য জেল চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের।

ইতিহাস-ঐতিহ্যে গুরুত্ব : প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রিটিশ আমলে ১৭৮৮ সালের গোড়ার দিকে ঢাকার একটি মোগল দুর্গ সংস্কার করে এর ভেতর একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণ করা হয়। ব্রিটিশ আমলে এটিই পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রূপ লাভ করে। ২২৮ বছর পর ২০১৬ সালের ২৯ জুলাই কারাগারটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর হয়। এরপর খালি হয়ে যাওয়া বিশাল কারা স্থাপনার ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার।

গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ প্রকল্পে বেশ কিছু বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করা হয়। আগে শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প সাজানো হয়েছিল। এখন ব্যক্তির স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্ব কমিয়ে নজর দেওয়া হচ্ছে ঢাকার সংস্কৃতি-ঐতিহ্যে।

আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস : ঢাকাকে ৪০০ বছরের পুরনো নগরী বলা হলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো জেলখানার কিছু অংশ খনন করে প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো নিদর্শন খোঁজে পেয়েছেন। এসব নিদর্শন সি জোনের জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে।

এই প্রকল্পের অধীনে সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল প্রতœতত্ত্ব গবেষক ও শিক্ষার্থী ২০১৭-১৮ সালে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রতœতাত্ত্বিক খননকাজ করেন। তারা কারাগারের প্রধান ফটকের সামনের অংশ, রজনীগন্ধা ভবনের আঙিনা, কারা হাসপাতালের সামনের অংশ, দশ সেল ও যমুনা ভবনের পশ্চিম এলাকার পাঁচ স্থানে ১১টি খননকাজ করেন। এতে একটি প্রাচীন দুর্গের দেয়াল, কক্ষ, নর্দমা, কূপের সন্ধান পান। এ ছাড়া এখানে কড়ি, মোগল আমলের ধাতব মুদ্রা, বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির ভাস্কর্যসহ অনেক ধরনের প্রতœনিদর্শন পান।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার হলো, কয়েকটি ‘গ্লেজড মৃৎপাত্র’ (অনেকটা সিরামিকের মতো চকচকে) এবং ‘রোলেটেড মৃৎপাত্র’ (মসৃণ ও সূক্ষ্ম নকশা করা), যা থেকে অনুমান করা যাচ্ছে, ঢাকায় অন্তত পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দে জনবসতি ছিল।

এ নিয়ে সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, একই ধরনের মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে প্রাচীন পু-্রবর্ধন (মহাস্থান) ও উয়ারী বটেশ্বরে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ায়। এই মৃৎপাত্র পাওয়ায় প্রমাণিত হচ্ছে, এখানে একটি আদি ঐতিহাসিক যুগে সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। প্রাচীন সিল্ক রুটের সঙ্গে এই জনপদের সংযোগ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সূত্রে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল এবং এর বয়স আনুমানিক আড়াই হাজার বছর।

আলাপকালে প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুবুর রব (উপসচিব) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রকল্পটি পুরান ঢাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। পর্যটনে অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি জিমনেশিয়াম, সুইমিং পুল, খেলার মাঠসহ নানা সুযোগ-সুবিধা তাদের হাতের নাগালে চলে আসবে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের বি জোনের কাজ প্রায় শেষ। আশা করছি, আগামী অক্টোবরে উদ্বোধন করতে পারব। এই লক্ষ্যে সবাই কাজ করে যাচ্ছে।