টালমাটাল এশিয়ার বাণিজ্য

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘শুল্ক’ রীতিমতো অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মাগা কর্মসূচি (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) অংশ হিসেবে তিনি একের পর এক দেশের ওপর বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করে যাচ্ছেন। সে ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র জাপানের ওপরও ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। জাপান ছাড়াও আরও ২৩টি দেশ এই তালিকায় যুক্ত রয়েছে, যাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র নতুন শুল্ক বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি দেশই এশিয়ার। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত। এগুলো সব রপ্তানি-নির্ভর শিল্পভিত্তিক দেশ।

মিত্র দেশের প্রেসিডেন্টের এমন শুল্ক হুমকিকে গভীরভাবে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা। টোকিও ও ওয়াশিংটন ডিসি বহুদিন ধরেই এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে চেষ্টা করছিল। জাপান তার গাড়ি শিল্পকে রক্ষা করতে কিছু সুবিধা চাচ্ছিল। আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চালের বাজার উন্মুক্তের চাপ প্রতিহত করছিল। বিষয়টি নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে বহুবার আলোচনা হয়েছে। গত এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প তার প্রথম দফার ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেন। মূলত তখন থেকেই জাপানের শুল্ক আলোচকরা ওয়াশিংটন ডিসিতে অন্তত সাতবার সফর করেছেন। কিন্তু এই সফরগুলো খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। আলোচনার গতি ধীর হতে থাকায় ট্রাম্প টোকিওকে ‘দৃঢ়’ থেকে ‘অতিনির্ভরশীল’ বলেও অভিহিত করেছেন।

গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, কানাডা থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। তিনি আরও বলেছেন, অধিকাংশ বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাম্প মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাকে গুরুত্ব না দিয়ে এই বাড়তি শুল্ক আরোপের বিষয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেছেন- বাকি সব দেশকেই দিতে হবে, সেটা ২০ শতাংশ হোক বা ১৫ শতাংশ। এটা আমরা এখন ঠিক করব। বিশ্বজুড়ে দেশগুলোকে ১ আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু জাপান ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়েও যেখানে কঠিন শুল্কের মুখে, সেখানে অন্য দেশগুলো ভাবতে বাধ্য হচ্ছে তাদের সুযোগ কতটা?

ট্রাম্প আবারও শুল্ক ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তাহলে এখন প্রশ্ন কে জিতছে আর কে হারছে? এক দিক থেকে দেখতে গেলে, যেসব দেশকে ট্রাম্প আগে শুল্কের লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন, তারা সবাই কিছুটা সুবিধা পেয়েছে। কারণ তারা এখন নতুন করে আরও তিন সপ্তাহ সময় পাচ্ছে চুক্তি করতে। ইউনাইটেড ওভারসিজ ব্যাংকের গবেষণা প্রধান সুয়ান টেক কিন বলেন, এই মুহূর্তে ১ আগস্টের সময়সীমার আগে আরও আলোচনার জন্য চাপ তৈরি হয়েছে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশ এই সপ্তাহেই শুল্ক চিঠি পেয়েছে। তারা এখন সমাধানের পথ খুঁজতে আরও আগ্রহী হয়ে উঠবে। দেশগুলো এমন এক জটিল অবস্থায় পড়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য উত্তেজনার প্রভাবে চীনা পণ্য যেসব তৃতীয় দেশের মাধ্যমে রপ্তানি হয়, সেগুলোকেও টার্গেট করা হচ্ছে।

বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বিবিসিকে বলেছেন, বাণিজ্য চুক্তির জটিলতা বিবেচনায় ভবিষ্যতে আরও সময় বাড়ানো হতে পারে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের বিজনেস লেকচারার অ্যালেক্স ক্যাপরি বলেন, ট্রাম্পের দাবিগুলো স্পষ্ট নয়। ফলে দেশগুলোর জন্য তা বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন হবে। উদাহরণ হিসেবে, ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে যে ট্রানশিপড (তৃতীয় দেশের মাধ্যমে রপ্তানি) পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ হবে। কিন্তু এই শুল্ক কি কেবল প্রস্তুত পণ্যের ওপর, নাকি সব ধরনের উপাদানেও প্রযোজ্য, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে সরবরাহ চেইন নজরদারির জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োজন হবে বলে মত দিয়েছেন ক্যাপরি। তিনি বলেন, এটি হবে ধাপে ধাপে, দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবর্তনশীল একটি প্রক্রিয়া। এতে অনেক তৃতীয় পক্ষ, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং লজিস্টিকস পার্টনাররা যুক্ত থাকবেন। শুল্ক এখন স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের যেসব কোম্পানি বিশ্বজুড়ে ব্যবসা পরিচালনা করে, তারা এখন বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক অ্যালেক্স ক্যাপরি। এতে শুধু রপ্তানিকারকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারক ও ভোক্তারাও চাপের মধ্যে পড়ছেন।

এই পরিস্থিতি এশিয়ার অনেক দেশের অর্থনৈতিক স্বপ্নের জন্য একটি বড় ধাক্কা। কারণ এই অঞ্চল মূলত উৎপাদন খাতের ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে, ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে বস্ত্রশিল্প পর্যন্ত। ক্যাপরি বলেন, কোন দেশ জিতছে আর কোন দেশ হারছে, এমন সরল উপসংহারে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এতটাই পরস্পর নির্ভরশীল যে, একপক্ষের ক্ষতি মানেই আরেক পক্ষের লাভ বলা কঠিন। তবে কিছু কিছু দেশ অন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ভিয়েতনাম এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের সামনে তাদের শক্তির পরিমাণ খুব কম। এখন তারা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের মুখোমুখি। একই অবস্থা কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রেও। এই দরিদ্র দেশটি রপ্তানিনির্ভর এবং ৩৫ শতাংশ শুল্কের হুমকির মধ্যে একটি চুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তারা ধনী এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বেশি প্রভাবশালী। ফলে তারা হয়তো কিছুটা সময় নিতে পারবে। ভারতের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান রয়েছে। কিন্তু দেশটি এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো শুল্ক চিঠি পায়নি। একটি চুক্তি প্রায় শেষ হওয়ার পর্যায়ে ছিল। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অমত থাকায় আটকে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের কৃষিপণ্যের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার এবং আমদানি সংক্রান্ত নিয়মনীতি। অর্থনীতিবিদ জেসপার কোল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও জাপানকে অন্য এশীয় বাণিজ্য অংশীদারদের মতোই দেখা হচ্ছে। এটি জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে বদলে দিতে পারে। কারণ দেখা যাচ্ছে, আর্থিক বিপুল সঞ্চয় নিয়ে উভয় দেশই দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। কোল বলেন, জাপান কঠিন আলোচক হিসেবে পরিচিত। আমি মনে করি, এই বিষয়টি ট্রাম্পকে বিরক্ত করেছে।

জাপানে চালের ঘাটতি থাকলেও প্রধানমন্ত্রী ইশিবা যুক্তরাষ্ট্রের চাল কেনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দেশের কৃষকদের রক্ষায় অটল থেকেছেন। একই সঙ্গে তার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়ের চাপেও মাথানত করেনি। আর এ বিষয়ে জাপান কোনো ছাড় না দিয়ে উল্টো ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও মনে করেন কোল। তিনি জানান, এপ্রিলে ট্রাম্প যখন প্রথমবারের মতো শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, তার পরদিনই টোকিও অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলোর সহায়তায় শত শত পরামর্শ কেন্দ্র খুলে দেয়। কোলের মতে, জাপান এমন একটি চুক্তি চাইবে যা বিশ্বাসযোগ্য। কারণ ট্রাম্প যে আবারও সিদ্ধান্ত বদলাবেন না, তার নিশ্চয়তা কী? জাপানে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নির্বাচন এই মাসেই। ফলে আগস্টের মধ্যে চুক্তি হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা অস্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, এই শুল্ক কি জাপানে মন্দা ডেকে আনবে?

এশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রস্থল। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলছে।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই চুক্তিগুলো এতটাই জটিল যে, বারবার সময়সীমা বাড়িয়ে ট্রাম্প হয়তো নিজের অবস্থান দুর্বল করে ফেলছেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির অধ্যাপক ডেভিড জ্যাকস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আসল শক্তি কতটা কম, তা নিজেরাই প্রকাশ করে ফেলেছে। ফলে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেছে। তিনি আরও বলেন, এখন যে চুক্তিগুলো হচ্ছে, সেগুলোর জন্য গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা বাণিজ্য ও সম্পর্কগুলো নতুন করে সাজাতে হতে পারে। আর অ্যালেক্স ক্যাপরি বলেন, ট্রাম্প ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক পথ না মেনে সরাসরি অনলাইনে শুল্ক চিঠি প্রকাশ করেছেন, যা রাজনৈতিক নাটকের মতো। এতে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা চীনের জন্য একটি বড় উপহার। কারণ চীন নিজেকে ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতির বিপরীতে স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে চাচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়। চীনেরও এই অঞ্চলের অনেক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে টানাপড়েন রয়েছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে জাপান পর্যন্ত। চীন নিজেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় রয়েছে। তবে তাদের জন্য সময়সীমা কিছুটা বেশি, ১৩ আগস্ট পর্যন্ত। বাণিজ্যযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে বেশি মিত্র জোগাড় করতে পারবে তা বলা কঠিন। তবে প্রতিযোগিতা এখনো চলছে। অধ্যাপক জ্যাকস বলেন, উভয় পক্ষই এই সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়। কিন্তু সেই পথে যাওয়া কঠিন হবে এবং এই প্রক্রিয়া হয়তো বছর নয়, দশক ধরে চলবে।