তওবার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত

মানুষ কমবেশি গুনাহ করে। এটি স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন আল্লাহর রহমতের চেয়ে সেটা বড় নয়। অন্তরের গভীর থেকে কেউ যদি তওবা করে তবে মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। সবার জন্য তিনি তওবার দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তওবার নিয়তে দ্বীনের পথে এগিয়ে আসা ব্যক্তিকে তিনি নিরাশ করেন না।

কোরআন ও হাদিসে এমন অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো মহান আল্লাহর অনন্ত দয়া, ক্ষমাশীলতা ও ভালোবাসার নিদর্শন হয়ে আছে। সেগুলোর মধ্যে হাদিসে বর্ণিত এক ব্যক্তির ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যিনি নিরানব্বই জন মানুষ হত্যা করার পরও আল্লাহর দয়ার সন্ধান করেন। প্রথমে ভুল জায়গায় পরামর্শ নিতে গিয়ে আরও একটি হত্যা করেন, কিন্তু পরে একজন প্রকৃত আলেমের সান্নিধ্যে এসে তওবার যথার্থ পথ খুঁজে পান। ঘটনাটি উল্লেখ করা হলো।

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে এক লোক ছিল। সে নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করার পর লোকদের জিজ্ঞাসা করল, এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আলেম ব্যক্তি কে? তাকে এক পথপ্রদর্শকের সন্ধান দেওয়া হলো। সে তার কাছে এসে বলল, সে নিরানব্বই ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, এমতাবস্থায় তার জন্য কি তওবার কোনো ব্যবস্থা আছে? পথপ্রদর্শক বলল, না। তখন সেই পথপ্রদর্শককেও হত্যা করে ফেলল। এ হত্যা দ্বারা একশটি পূর্ণ হলো।

তারপর সে আবার লোকদের প্রশ্ন করল, এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আলেম কে? তখন তাকে এক আলেম ব্যক্তির সন্ধান দেওয়া হলো। সেই আলেমের কাছে এসে বলল, সে একশ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, তার জন্য কি তওবার ব্যবস্থা আছে? আলেম ওই ব্যক্তি বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। এ তওবার মধ্যে কে অন্তরায় হতে পারে? তুমি অমুক দেশে যাও। সেখানে কতিপয় লোক আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত আছে। তুমিও তাদের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদতে মশশুল হয়ে যাও। নিজের দেশে আর কখনো ফিরে যেয়ো না। কেননা এ দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়।

তারপর সে চলতে লাগল। এমনকি যখন সে অর্ধেক পথ পৌঁছে গেল তখন তার মৃত্যু হলো। এরপর রহমতের ফেরেশতা ও আজাবের ফেরেশতার মধ্যে তার সম্পর্কে বিবাদ লেগে গেল। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, সে অন্তরের আবেগ নিয়ে তওবার জন্য মহান আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়ে এসেছে। আর আজাবের ফেরেশতারা বললেন, সে তো কখনো কোনো নেক আমল করেনি। এ সময় মানুষের সুরতে এক ফেরেশতা এলেন। তারা তাকে তাদের মধ্যে মীমাংসাকারী নির্ধারণ করলেন।

তিনি তাদের বললেন, তোমরা দুই দেশের মধ্যবর্তী দূরত্ব মেপে নাও। দুই স্থানের মধ্যে যে স্থানের দিকে সে অধিক নিকটবর্তী হবে তাকে সে স্থানেরই গণ্য করা হবে। তারা মাপলেন। তখন তারা তাকে উদ্দিষ্ট স্থানের অধিক নিকটবর্তী পেলেন। তখন রহমতের ফেরেশতা তাকে কবজ করে নিলেন।

হজরত কাতাদা (রহ.) বলেন, হাসান (রহ.) বলেছেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন সে মৃত্যুমুখে পতিত হলো, তখন সে বুকের ওপর ভর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেল। (সহিহ মুসলিম ৬৭৫২) এ হাদিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা পাওয়া যায়।

রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া : মহান আল্লাহর রহমত সবার ওপর বিস্তৃত। তওবা কবুলের ব্যপারে রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। একজন মানুষ যত বড় পাপীই হোক তার তওবা করার সুযোগ আছে।

খাঁটি তওবা করলে মহান আল্লাহ বড় থেকে বড় পাপও ক্ষমা করেন।

যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া : জীবন গঠনে সুযোগ্য আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। প্রকৃত আলেম সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে জান্নাতের পথে পরিচালিত করতে পারেন। অযোগ্য ও  আমলহীন আলেমের সাহচর্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। হাদিসে বর্ণিত পথপ্রদর্শক না জেনে মাসয়ালা দিয়ে নিজেই হত্যার স্বীকার হয়েছেন।

উত্তম পরিবেশে অবস্থান করা : মানুষের জীবনে মন্দ পরিবেশ আর সঙ্গদোষের প্রভাব প্রতিফলিত হয়। ক্রমান্বয়ে মানুষ দ্বীনের পথ থেকে ছিটকে যায়। তাই নেককার লোকের সান্নিধ্যের সৌরভ নিতে হয়। এটা আত্মশুদ্ধির অন্যতম একটি উপায়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তওবা ১১৯)

মানুষ হত্যা মহাপাপ : ইসলাম মানবজীবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। পরস্পরের মধ্যে সম্মান, নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা দিয়েছে। অন্যায়ভাবে রক্তপাত ও মানব-হত্যাকে মহাপাপ ঘোষণা করেছে। কোরআনের ভাষ্যমতে একজন মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। হাদিসে বর্ণিত ১০০ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তির ক্ষমা পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে মহান আল্লাহর দয়া-মায়ার পূর্ণাঙ্গ এক চিত্র ফুটে উঠেছে। সুতরাং মানুষ হত্যা থেকে বিরত হওয়া দুনিয়া এবং আখেরাতে সবার জন্য কল্যাণকর।

মানুষ কখনো সৎপথে চলে, আবার কখনো ভুল করে পথভ্রষ্ট হয়। আল্লাহতায়ালা মানুষকে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছেন এবং তওবার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত রেখেছেন। তাই একজন ব্যক্তি যত বড় পাপেই লিপ্ত হোক না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই। আন্তরিক তওবা ও সংশোধনের ইচ্ছা থাকলে তার জন্যও ক্ষমার পথ খোলা রয়েছে।