ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের বন বিভাগ ২০২০ সালের পর দেশের প্রথম সিংহ গণনার ফল প্রকাশ করে গত ২১ মে। ওই জরিপ অনুযায়ী, গুজরাটেই বন্যসিংহের সংখ্যা গত পাঁচ বছরে ৩২ শতাংশ বেড়ে ৮৯১-এ পৌঁছেছে। ভারতে সিংহ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে গুজরাটের গির অরণ্য ও আশপাশের এলাকাগুলোকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে, বিশেষ করে ১৯৬৫ সালে গির ন্যাশনাল পার্ক ও অভয়ারণ্য স্থাপনের পর থেকে। বর্তমানে সিংহ গির অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে এবং আলাদা ছোট ছোট উপ-জনসংখ্যা গড়ে তুলেছে। এখন গুজরাটের ১১টি জেলায় সিংহের উপস্থিতি রয়েছে। তবে এবার প্রথমবারের মতো গণনায় দেখা গেছে, গিরের মূল অঞ্চলের চেয়ে গিরের বাইরের নয়টি উপ-জনসংখ্যায় (স্যাটেলাইট পপুলেশন) বেশি সিংহ রয়েছে। গির অঞ্চলে রয়েছে ৩৯৪টি সিংহ, আর বাইরের এই নয়টি উপ-জনসংখ্যায় রয়েছে ৪৯৭টি সিংহ। এর মধ্যে গিরের আশপাশের জেলায় নতুন তিনটি সিংহের বসতি গড়ে উঠেছে- যেমন বারদা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, জেটপুর শহরসংলগ্ন এলাকা এবং বাবরা ও জাসদন শহরের আশপাশের অঞ্চল সবই গুজরাটে অবস্থিত। গণনা প্রতিবেদনে বারদা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে গুজরাটে সিংহের দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সিংহের সংখ্যা যতই বাড়ুক না কেন, এর আড়ালে থেকে যাচ্ছে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা প্রশ্ন তুলছেন, ভারত যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না মানুষের সঙ্গে সিংহের দ্বন্দ্ব কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে সিংহের টিকে থাকা নিশ্চিত করতে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ২৫ জুন গুজরাটের আমরেলি জেলায় এক সিংহ একটি খামার থেকে পাঁচ বছরের এক শিশুকে টেনে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে। এই ঘটনা দেখায় যে, সিংহের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে।
তবে বড় বিড়াল সংরক্ষণের বিশেষজ্ঞ এবং ভারতের ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউটের (ডব্লিউআইআই) সাবেক কর্মকর্তা যদবেন্দ্রদেব ঝালা সতর্ক করে বলেন, বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ঘুরে বেড়ানো বন্য মাংসাশীদের মোট সংখ্যা গণনারর পদ্ধতিটি তাদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক উপায় নয়। ১৯৮৫ সাল থেকে সিংহ সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ রবি চেল্লমও গুজরাটের এই পদ্ধতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ২০১০ সালের পর থেকে গুজরাটে সিংহের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, আর এদের বিচরণক্ষেত্র ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার থেকে ৩৫ হাজার বর্গকিলোমিটারে পৌঁছেছে। রবি চেল্লম সতর্ক করেছেন, এই সিংহরা নানা বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে- খোলা কূপে পড়ে যেতে পারে, ভারী গাড়ি বা ট্রেনের ধাক্কায় মারা যেতে পারে, বৈদ্যুতিক তারে বিদ্যুতায়িত হতে পারে বা বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছেন, এখন নিয়মিতই সিংহদের অস্বাভাবিক স্থানে দেখা যাচ্ছে যেমন মানুষের বাড়ির ছাদে, হোটেলের বেজমেন্ট পার্কিংয়ে, এমনকি ব্যস্ত মহাসড়কে। রবি চেল্লম বলেন, এই অঞ্চল ইতিমধ্যেই তার ধারণক্ষমতার অনেক বেশি সীমা অতিক্রম করেছে। তার মতে, যেখানে মূলত মানুষের বসতি, সেখানে সিংহের সংখ্যা বাড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।