ঢাবিতে সেই প্রতিরোধের ১৬ জুলাই আজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায় রচিত হয়েছিল ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। আগের দিন ১৫ জুলাই ঢাবি ক্যাম্পাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ভয়াবহ হামলার জের ধরে ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে। বহিরাগতদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো তা-বে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত হয়। নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলায় নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন বিভিন্ন হলের ছাত্ররা। রাত ১২টার দিকে শুরু হয় ‘ছাত্রলীগমুক্ত হল’ অভিযান। এ সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হল থেকে পালিয়ে গেলে ১৭ জুলাই দুপুরের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে ঢাবি হলগুলোয় নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্র রাজনীতি।

১৫ জুলাই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলায় কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া, ফুলার রোড, ভিসি চত্বরের রাস্তা শিক্ষার্থীদের রক্তে রঞ্জিত হয়। নারী শিক্ষার্থীদেরও সেদিন ছাড় দেয়নি সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ। যে কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে, তারা দলমত-নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হল থেকে ছাত্রলীগকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদে ছাত্রছাত্রীদের অভিযান শুরু হয়। ১৬ জুলাই সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স ফ্যাকাল্টির তিনটি হলে ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষগুলোয় হামলা চালান শিক্ষার্থীরা। পরে ১৬ জুলাই রাত ১টা থেকে ১৭ জুলাই সকাল পর্যন্ত পালাক্রমে অন্যান্য হলে ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়।

মূলত হল থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করার প্রাথমিক ধাপ শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা। ১৬ জুলাই রাত ১০টার দিকে হলে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হল প্রদক্ষিণ করেন এবং ছাত্রলীগ নিষিদ্ধসহ হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান। এ সময় ফুলের গালিচা মাড়িয়ে হলে প্রবেশকারী হল ছাত্রলীগ সভাপতি আতিকা বিনতে হোসাইনসহ অন্য নেত্রীদের মারধর করে টেনেহিঁচড়ে বের করে দেন শিক্ষার্থীরা। পরে রাত দেড়টার দিকে হল প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে রোকেয়া হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। একে একে শামসুন্নাহার ও সুফিয়া কামাল, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলে নিষিদ্ধ হয় ছাত্রলীগ ও ছাত্র রাজনীতি।

ছেলেদের ১৩টি হলের মধ্যে প্রথম ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হয় শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে। ১৬ জুলাই রাত ১২টা থেকেই হলে মিছিল শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ভয়ে পালিয়ে গেলে হল দখলে নেন শিক্ষার্থীরা। পরে ১৭ জুলাই ভোর ৪টার দিকে হলগেটে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাদের রুমে ভাঙচুর চালান এবং ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের জোর দাবি জানান। পরে সকাল ৫টায় হল প্রশাসন বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধসহ সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সকাল ৯টার মধ্যেই একে একে ছেলেদের বাকি ১১টি হলেই নিষিদ্ধ হয় ছাত্রলীগ ও ছাত্র রাজনীতি। সর্বশেষ ১৭ জুলাই দুপুরের দিকে ছাত্রলীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জগন্নাথ হলে নিষিদ্ধ হয় ছাত্রলীগ ও ছাত্র রাজনীতি।

তবে ছাত্রলীগকে হল থেকে বের করে দেওয়ার কাজটি শুরু করেছিল ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের শিক্ষার্থীরা। ১৬ জুলাই সন্ধ্যার দিকেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হল থেকে বিতাড়িত করা শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা স্লোগানে স্লোগানে হল প্রদক্ষিণ ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষ ভাঙচুর করেন। পরে তা অন্যান্য হলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে গণজোয়ার তৈরি হয়।

এদিন দুপুরের পর চানখাঁরপুল-ঢাকা মেডিকেল কলেজ রোড এবং চানখাঁরপুল থেকে দোয়েল চত্বর রোডে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ইউনিটের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ফজলুল হক মুসলিম ও অমর একুশে হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশি নিরাপত্তায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেন। শিক্ষার্থীরা শহীদুল্লাহ হলকে ক্যাম্প বানিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এদিন গুটিকয়েক শিক্ষার্থী চানখাঁরপুল মোড়ে অবস্থিত হলের ক্যানটিনের ছাদে অবস্থান নিয়ে ছাত্রলীগের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেন। এতে শিক্ষার্থীদের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়। এই অবস্থানকে সেদিনের সবচেয়ে ‘সফল কৌশল’ বলে বিবেচনা করা হয়। এ সময় ছাত্রলীগের হামলায় কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

এই পাল্টাপাল্টি ধাওয়া দুপুরে শুরু হয়ে রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচেষ্টায় শেষ হয়। যদিও পুরো সময় নির্বিকার ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ঠেকাতে কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা না থামিয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের সামনে ঢাল হয়ে অবস্থান নেয়। এই ব্যর্থতার জেরেই অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা ভিসি মাকসুদ কামালকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।

১৬ জুলাই রাতে সারজিস আলমের নেতৃত্বে অমর একুশে হলসংলগ্ন জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে ব্যারিকেড বসায় হলটির শিক্ষার্থীরা। এ সময় মহানগর ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেল শোডাউন দিয়ে নাজিরাবাজার রাস্তা হয়ে অমর একুশে হলের সামনে দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চাইলে তাদের কয়েকজনকে ধাওয়া করে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। এদিন তারা ১৭টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন এবং ওই এলাকায় সবার প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সূচনালগ্নে ঢাবি ক্যাম্পাসে এটাই ‘বৃহৎ প্রতিরোধব্যবস্থা’ বলে বিবেচনা করা হয়।