রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির জঙ্গল ইউনিয়নের অলংকারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) মো. আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানিসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাকে তিরস্কার দিয়ে ‘লঘুদ-’ দেওয়া হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তে বিদ্যালয়ের অভিভাবক, স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও নারী অধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশ থেকে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক আবদুল হালিম অফিস কক্ষ ব্যবহার না করে দোতলার ওয়াশরুম-সংলগ্ন নাইটগার্ডের একটি কক্ষে ছাত্রীদের ডেকে নিতেন। ওই কক্ষে ‘সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ’ লেখা একটি সাইনবোর্ড টাঙানো ছিল, যাতে অন্য কেউ প্রবেশ না করে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাত্রিকালেও স্ত্রীসহ ওই কক্ষে অবস্থান করতেন।
গত ২১ জানুয়ারি নতুন এক ছাত্রী ভর্তি হতে এলে অভিভাবককে বাইরে পাঠিয়ে ছাত্রীকে একা ওই কক্ষে রাখেন শিক্ষক। এরপর তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সহকর্মী শিক্ষকরা বাধা দেন। বাধার মুখে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি এসেছে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে নদীর পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং শরীরে কাদা মেখে তার ছবি তোলা হয়। এসব অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও অভিযুক্ত শিক্ষক মো. আবদুল হালিমকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল, বিধিমালা ২০১৮-এর ২(২) ধারা অনুযায়ী তিরস্কার সূচক ‘লঘুদ-’ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তেই মূলত ক্ষোভের সূত্রপাত।
স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে, মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষক মো. আবদুল হালিম গুরুতর অপরাধ করেও লঘুদ-ে দ-িত হয়েছেন। এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শুধু “তিরস্কার” দিয়েই দায় শেষ করা হয়েছে। তাতে মনে হচ্ছে, কিছু টাকা খরচ করেই সব ম্যানেজ করে নিয়েছে।’
আরেক অভিভাবক বলেন, ‘আমরা ভাবলাম এত বড় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর তার চাকরিই থাকবে না। অথচ দেখা গেল, তাকে শুধু ধমক দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব?’
স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে জানান, তারা নিজেরাই পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রত ও আতঙ্কিত। এক শিক্ষক বলেন, ‘একই প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা যারা সততার সঙ্গে কাজ করি, তাদের জন্যও এখন মাথা উঁচু করে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ লস্কর নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়টি একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তাকে এখনো এই বিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে বলবৎ রাখা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের সম্মানের দিকে তাকিয়ে হলেও আগে তাকে বদলি করার দাবি জানাচ্ছি।’
এদিকে ঘটনার পর বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে। অভিভাবকরা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকে বলছেন, ‘যে স্কুলে শিক্ষকরাই ভয়ংকর, সেখানে সন্তানদের পাঠাতে ভরসা পাই না।’ সমাজের সুশীল ব্যক্তিরা মনে করেন, প্রশাসনিকভাবে এ ঘটনাটি যেভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তা শুধু একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা নয়। পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। সমাজের চোখে একজন শিক্ষক শুধুই পাঠদাতাই নন, তিনি আদর্শও। কিন্তু সেই শিক্ষকের হাতেই যদি শিক্ষার্থী ক্ষতবিক্ষত হয়, তাহলে বিচারহীনতা শুধু এক শিক্ষার্থীর নয়, একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের ওপরও আঘাত।
রাজবাড়ী জেলা মহিলা পরিষদের সদস্য আইনজীবী নাজমা সুলতান বলেন, ‘যেহেতু এই অভিযোগটি একজন সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে। যদি তিনি এই কাজটি করে থাকেন, তাহলে আমি মনে করি, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ কাজটি করেছেন। এই অপরাধের জন্য একদিকে যেমন তার বিভাগীয় শাস্তি হওয়া উচিত আবার পেনাল সেকশনেও শাস্তি হওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে দন্ডপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল হালিম বলেন, ‘আমি ২০২৪ সালের মে মাসে এই বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি। গত ১৬ ডিসেম্বর বাচ্চারা ভাস্কর্য বানানোর জন্য নিজেরাই শরীরে কাদা মাখে। বিষয়টি নিয়ে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার।’
প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তবিবুর রহমান বলেন, অলংকারপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। সেখানে তাকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই রায়টি সার্বিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে। যদি সংক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি এই রায়ে সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তিনি আপিল করতে পারেন। আবার যার বিরুদ্ধে এই রায় দেওয়া হয়েছে, তিনি চাইলে আপিল করতে পারেন।